5 Popular Durga Puja Kobita by Rabindranath Tagore

দুর্গা পূজা কবিতা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দুর্গা পূজার আগমনী কবিতা [Durga Puja Kobita by Rabindranath Tagore, Durga Puja Bengali Poems] (Durga Puja Poems by Rabindranath Tagore, Durga Puja Bangla Kobita)

মা দুর্গা বছরে একবার আমাদের মধ্যে আসেন আর এই সময় সমগ্র বাঙালি জাতি মেতে ওঠে তাঁর আগমনের খুশিতে। তাই মায়ের আগমন উপলক্ষে নিয়ে এসেছি দুর্গা পূজার আগমনী কবিতারবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর জীবনকালে মা দুর্গাকে উৎসর্গ করে অনেক কবিতাই লিখে গেছেন।

আজ আমরা তারই মধ্যে থেকে বেঁছে নিয়েছি 5 Popular Durga Puja Kobita by Rabindranath Tagore যার মধ্যে আছে – Pujar Saj, Prothom Puja, Agomoni, Kangalini, Chutir Ayojon যেগুলো বড়দের ও ছোটদের একবার হলেও পড়া উচিত। তাহলে এক এক করে দেখে নেওয়া যাক Durga Puja Kobita গুলো-

Pujar Saj Kobita Lyrics

আশ্বিনের মাঝামাঝি উঠিল বাজনা বাজি,
পূজার সময় এল কাছে।
মধু বিধু দুই ভাই ছুটাছুটি করে তাই,
আনন্দে দু-হাত তুলি নাচে।
পিতা বসি ছিল দ্বারে, দুজনে শুধালো তারে,
“কী পোশাক আনিয়াছ কিনে।’
পিতা কহে, “আছে আছে তোদের মায়ের কাছে,
দেখিতে পাইবি ঠিক দিনে।’
সবুর সহে না আর — জননীরে বার বার
কহে, “মা গো, ধরি তোর পায়ে,
বাবা আমাদের তরে কী কিনে এনেছে ঘরে
একবার দে না মা, দেখায়ে।’
ব্যস্ত দেখি হাসিয়া মা দুখানি ছিটের জামা
দেখাইল করিয়া আদর।
মধু কহে, “আর নেই?’ মা কহিল, “আছে এই
একজোড়া ধুতি ও চাদর।’
রাগিয়া আগুন ছেলে, কাপড় ধুলায় ফেলে
কাঁদিয়া কহিল, “চাহি না মা,
রায়বাবুদের গুপি পেয়েছে জরির টুপি,
ফুলকাটা সাটিনের জামা।’
মা কহিল, “মধু, ছি ছি, কেন কাঁদ মিছামিছি,
গরিব যে তোমাদের বাপ।
এবার হয় নি ধান, কত গেছে লোকসান,
পেয়েছেন কত দুঃখতাপ।
তবু দেখো বহু ক্লেশে তোমাদের ভালোবেসে
সাধ্যমত এনেছেন কিনে।
সে জিনিস অনাদরে ফেলিলি ধূলির ‘পরে–
এই শিক্ষা হল এতদিনে।’
বিধু বলে, “এ কাপড় পছন্দ হয়েছে মোর,
এই জামা পরাস আমারে।’
মধু শুনে আরো রেগে ঘর ছেড়ে দ্রুতবেগে
গেল রায়বাবুদের দ্বারে।
সেথা মেলা লোক জড়ো, রায়বাবু ব্যস্ত বড়ো;
দালান সাজাতে গেছে রাত।
মধু যবে এক কোণে দাঁড়াইল ম্লান মনে
চোখে তাঁর পড়িল হঠাৎ।
কাছে ডাকি স্নেহভরে কহেন করুণ স্বরে
তারে দুই বাহুতে বাঁধিয়া,
“কী রে মধু, হয়েছে কী। তোরে যে শুক্‌নো দেখি।’
শুনি মধু উঠিল কাঁদিয়া,
কহিল, “আমার তরে বাবা আনিয়াছে ঘরে
শুধু এক ছিটের কাপড়।’
শুনি রায়মহাশয় হাসিয়া মধুরে কয়,
“সেজন্য ভাবনা কিবা তোর।’
ছেলেরে ডাকিয়া চুপি কহিলেন, “ওরে গুপি,
তোর জামা দে তুই মধুকে।’
গুপির সে জামা পেয়ে মধু ঘরে যায় ধেয়ে
হাসি আর নাহি ধরে মুখে।
বুক ফুলাইয়া চলে — সবারে ডাকিয়া বলে,
“দেখো কাকা! দেখো চেয়ে মামা!
ওই আমাদের বিধু ছিট পরিয়াছে শুধু,
মোর গায়ে সাটিনের জামা।’
মা শুনি কহেন আসি লাজে অশ্রুজলে ভাসি
কপালে করিয়া করাঘাত,
“হই দুঃখী হই দীন কাহারো রাখি না ঋণ,
কারো কাছে পাতি নাই হাত।
তুমি আমাদেরই ছেলে ভিক্ষা লয়ে অবহেলে
অহংকার কর ধেয়ে ধেয়ে!
ছেঁড়া ধুতি আপনার ঢের বেশি দাম তার
ভিক্ষা-করা সাটিনের চেয়ে।
আয় বিধু, আয় বুকে, চুমো খাই চাঁদমুখে,
তোর সাজ সব চেয়ে ভালো।
দরিদ্র ছেলের দেহে দরিদ্র বাপের স্নেহে
ছিটের জামাটি করে আলো।


Chutir Ayojon Kobita Lyrics

কাছে এল পূজার ছুটি।
রোদ্‌দুরে লেগেছে চাঁপাফুলের রঙ।
হাওয়া উঠছে শিশিরে শির্‌শিরিয়ে,
শিউলির গন্ধ এসে লাগে
যেন কার ঠাণ্ডা হাতের কোমল সেবা।
আকাশের কোণে কোণে
সাদা মেঘের আলস্য,
দেখে মন লাগে না কাজে।

মাস্টারমশায় পড়িয়ে চলেন
পাথুরে কয়লার আদিম কথা,
ছেলেটা বেঞ্চিতে পা দোলায়,
ছবি দেখে আপন মনে–
কমলদিঘির ফাটল-ধরা ঘাট
আর ভঞ্জদের পাঁচিল-ঘেঁষা
আতাগাছের ফলে-ভরা ডাল।
আর দেখে সে মনে মনে তিসির খেতে
গোয়ালপাড়ার ভিতর দিয়ে
রাস্তা গেছে এঁকেবেঁকে হাটের পাশে
নদীর ধারে।

কলেজের ইকনমিক্‌স্‌-ক্লাসে
খাতায় ফর্দ নিচ্ছে টুকে
চশমা-চোখে মেডেল-পাওয়া ছাত্র–
হালের লেখা কোন্‌ উপন্যাস কিনতে হবে,
ধারে মিলবে কোন্‌ দোকানে
“মনে-রেখো’ পাড়ের শাড়ি,
সোনায় জড়ানো শাঁখা,
দিল্লির-কাজ-করা লাল মখমলের চটি।
আর চাই রেশমে-বাঁধাই-করা
অ্যাণ্টিক কাগজে ছাপা কবিতার বই,
এখনো তার নাম মনে পড়ছে না।

ভবানীপুরের তেতালা বাড়িতে
আলাপ চলছে সরু মোটা গলায়–
এবার আবুপাহাড় না মাদুরা
না ড্যাল্‌হৌসি কিম্বা পুরী
না সেই চিরকেলে চেনা লোকের দার্জিলিঙ।
আর দেখছি সামনে দিয়ে
স্টেশনে যাবার রাঙা রাস্তায়
শহরের-দাদন-দেওয়া দড়িবাঁধা ছাগল-ছানা
পাঁচটা ছটা ক’রে।
তাদের নিষ্ফল কান্নার স্বর ছড়িয়ে পড়ে
কাশের-ঝালর-দোলা শরতের শান্ত আকাশে।
কেমন ক’রে বুঝেছে তারা
এল তাদের পূজার ছুটির দিন।


Agomoni Kobita Lyrics

সুধীরে নিশার আঁধার ভেদিয়া
​​ ফুটিল প্রভাততারা।
হেথা হোথা হতে পাখিরা গাহিল
​​ ঢালিয়া সুধার ধারা।
মৃদুল প্রভাতসমীর পরশে
কমল নয়ন খুলিল হরষে,
হিমালয় শিরে অমল আভায়
​​ শোভিল ধবল তুষারজটা।
খুলি গেল ধীরে পূরবদ্বার,
ঝরিল কনককিরণধার,
শিখরে শিখরে জ্বলিয়া উঠিল,
​​ রবির বিমল কিরণছটা।
গিরিগ্রাম আজি কিসের তরে,
উঠেছে নাচিয়া হরষভরে,
অচল গিরিও হয়েছে যেমন
​​ অধীর পাগল-পারা।
তটিনী চলেছে নাচিয়া ছুটিয়া,
কলরব উঠে আকাশে ফুটিয়া ,
ঝর ঝর ঝর করিয়া ধ্বনি
​​ ঝরিছে নিঝরধারা।
তুলিয়া কুসুম গাঁথিয়া মালা,
চলিয়াছে গিরিবাসিনী বালা
অধর ভরিয়া সুখের হাসিতে
​​ মাতিয়া সুখের গানে।
মুখে একটিও নাহিকো বাণী
শবদচকিতা মেনকারানী
তৃষিত নয়নে আকুল হৃদয়ে,
​​ চাহিয়া পথের পানে।
আজ মেনকার আদরিণী উমা
​​ আসিবে বরষ-পরে।
তাইতে আজিকে হরষের ধ্বনি
​​ উঠিয়াছে ঘরে ঘরে।
অধীর হৃদয়ে রানী আসে যায়,
কভু বা প্রাসাদশিখরে দাঁড়ায়,
কভু বসে ওঠে, বাহিরেতে ছোটে
​​ এখনো উমা মা এলনা কেন?
হাসি হাসি মুখে পুরবাসীগণে
অধীরে হাসিয়া ভূধরভবনে,
“কই উমা কই’ বলে “উমা কই’,
​​ তিলেক বেয়াজ সহে না যেন!
বরষের পরে আসিবেন উমা
​​ রানীর নয়নতারা ,
ছেলেবেলাকার সহচরী যত
​​ হরষে পাগল-পারা।
ভাবিছে সকলে আজিকে উমায়
​​ দেখিবে নয়ন ভ’রে,
আজিকে আবার সাজাব তাহায়
​​ বালিকা উমাটি ক’রে।
তেমনি মৃণালবলয়-যুগলে,
তেমনি চিকন-চিকন বাকলে,
তেমনি করিয়া পরাব গলায়
​​ বনফুল তুলি গাঁথিয়া মালা।
তেমনি করিয়া পরায়ে বেশ
তেমনি করিয়া এলায়ে কেশ,
জননীর কাছে বলিব গিয়ে
​​ “এই নে মা তোর তাপসী বালা’।
লাজ-হাসি-মাখা মেয়ের মুখ
হেরি উথলিবে মায়ের সুখ,
হরষে জননী নয়নের জলে
​​ চুমিবে উমার সে মুখখানি।
হরষে ভূধর অধীর-পারা
হরষে ছুটিবে তটিনীধারা,
হরষে নিঝর উঠিবে উছসি,
​​ উঠিবে উছসি মেনকারানী।
কোথা তবে তোরা পুরবাসী মেয়ে
যেথা যে আছিস আয় তোরা ধেয়ে
বনে বনে বনে ফিরিবি বালা,
তুলিবি কুসুম, গাঁথিবি মালা,
​​ পরাবি উমার বিনোদ গলে।
তারকা-খচিত গগন-মাঝে
শারদ চাঁদিমা যেমন সাজে
তেমনি শারদা অবনী শশী
​​ শোভিবে কেমন অবনীতলে!
ওই বুঝি উমা, ওই বুঝি আসে,
​​ দেখো চেয়ে গিরিরানী!
আলুলিত কেশ, এলোথেলো বেশ,
​​ হাসি-হাসি মুখখানি।
বালিকারা সব আসিল ছুটিয়া
​​ দাঁড়াল উমারে ঘিরি।
শিথিল চিকুরে অমল মালিকা
​​ পরাইয়া দিল ধীরি।
হাসিয়া হাসিয়া কহিল সবাই
​​ উমার চিবুক ধ’রে,
“বলি গো স্বজনী, বিদেশে বিজনে
​​ আছিলি কেমন করে?
আমরা তো সখি সারাটি বরষ
​​ রহিয়াছি পথ চেয়ে —
কবে আসিবেক আমাদের সেই
মেনকারানীর মেয়ে!
এই নে, সজনী, ফুলের ভূষণ
এই নে, মৃণাল বালা,
হাসিমুখখানি কেমন সাজিবে
পরিলে কুসুম-মালা।’
কেহ বা কহিল,”এবার স্বজনি,
দিব না তোমায় ছেড়ে
ভিখারি ভবের সরবস ধন
আমরা লইব কেড়ে।
বলো তো স্বজনী, এ কেমন ধারা
এয়েছ বরষ-পরে,
কেমনে নিদিয়া রহিবে কেবল
তিনটি দিনের তরে।’
কেহ বা কহিল,”বলো দেখি,সখী,
মনে পড়ে ছেলেবেলা?
সকলে মিলিয়া এ গিরিভবনে
কত-না করেছি খেলা!
সেই মনে পড়ে যেদিন স্বজনী
গেলে তপোবন-মাঝে–
নয়নের জলে আমরা সকলে
সাজানু তাপসী-সাজে।
কোমল শরীরে বাকল পরিয়া
এলায়ে নিবিড় কেশ
লভিবারে পতি মনের মতন
কত-না সহিলে ক্লেশ।
ছেলেবেলাকার সখীদের সব
এখনো তো মনে আছে,
ভয় হয় বড়ো পতির সোহাগে
ভুলিস তাদের পাছে!’
কত কী কহিয়া হরষে বিষাদে
​​ চলিল আলয়-মুখে,
কাঁদিয়া বালিকা পড়িল ঝাঁপায়ে
​​ আকুল মায়ের বুকে।
হাসিয়া কাঁদিয়া কহিল রানী,
​​ চুমিয়া উমার অধরখানি,
“আয় মা জননি আয় মা কোলে,
​​ আজ বরষের পরে।
দুখিনী মাতার নয়নের জল
তুই যদি, মা গো, না মুছাবি বল্‌
তবে উমা আর ,কে আছে আমার
​​ এ শূন্য আঁধার ঘরে?
সারাটি বরষ যে দুখে গিয়াছে
​​ কী হবে শুনে সে ব্যথা,
বল্‌ দেখি, উমা, পতির ঘরের
​​ সকল কুশল-কথা।’
এত বলি রানী হরষে আদরে
​​ উমারে কোলেতে লয়ে,
হরষের ধারা বরষি নয়নে
​​ পশিল গিরি-আলয়ে।
আজিকে গিরির প্রাসাদে কুটিরে
​​ উঠিল হরষ-ধ্বনি,
কত দিন পরে মেনকা-মহিষী
​​ পেয়েছে নয়নমণি!


Kangalini Kobita Lyrics

আনন্দময়ীর আগমনে,
​​ আনন্দে গিয়েছে দেশ ছেয়ে।
হেরো ওই ধনীর দুয়ারে
​​ দাঁড়াইয়া কাঙালিনী মেয়ে।
উৎসবের হাসি-কোলাহল
​​ শুনিতে পেয়েছে ভোরবেলা,
নিরানন্দ গৃহ তেয়াগিয়া
​​ তাই আজ বাহির হইয়া
আসিয়াছে ধনীর দুয়ারে
​​ দেখিবারে আনন্দের খেলা।
বাজিতেছে উৎসবের বাঁশি
​​ কানে তাই পশিতেছে আসি,
ম্লান চোখে তাই ভাসিতেছে
​​ দুরাশার সুখের স্বপন;
চারি,দিকে প্রভাতের আলো,
​​ নয়নে লেগেছে বড়ো ভালো,
আকাশেতে​​ মেঘের মাঝারে
​​ শরতের কনক তপন।
কত কে যে আসে,​​ কত যায়,
​​ কেহ হাসে,​​ কেহ গান গায়,
কত বরনের বেশভূষা–
​​ ঝলকিছে কাঞ্চন-রতন,
কত পরিজন দাসদাসী,
​​ পুষ্প পাতা কত রাশি রাশি,
চোখের উপরে পড়িতেছে
​​ মরীচিকা-ছবির মতন।
হেরো তাই রহিয়াছে চেয়ে
​​ শূন্যমনা​​ কাঙালিনী মেয়ে।

শুনেছে সে,​​ মা এসেছে ঘরে,
​​ তাই বিশ্ব আনন্দে ভেসেছে,
মার মায়া পায় নি কখনো,
​​ মা কেমন দেখিতে এসেছে।
তাই বুঝি আঁখি ছলছল,
​​ বাষ্পে ঢাকা নয়নের তারা!
চেয়ে যেন মার মুখ পানে
বালিকা কাতর অভিমানে
​​ বলে, “মা গো এ কেমন ধারা।
এত বাঁশি,​​ এত হাসিরাশি,
​​ এত তোর রতন-ভূষণ,
তুই যদি আমার জননী,
​​ মোর কেন মলিন বসন!”

ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েগুলি
ভাইবোন করি গলাগলি,
​​ অঙ্গনেতে নাচিতেছে ওই;
বালিকা দুয়ারে হাত দিয়ে,
তাদের হেরিছে দাঁড়াইয়ে,
ভাবিতেছে নিশ্বাস ফেলিয়ে–
​​ আমি তো ওদের কেহ নই।
স্নেহ ক’রে আমার জননী
​​ পরায়ে তো দেয় নি বসন,
প্রভাতে কোলেতে করে নিয়ে
​​ মুছায়ে তো দেয় নি নয়ন।

আপনার ভাই নেই বলে
​​ ওরে কি রে ডাকিবে না কেহ?
আর কারো জননী আসিয়া
​​ ওরে কি রে করিবে না স্নেহ?
ও কি শুধু দুয়ার ধরিয়া
​​ উৎসবের পানে রবে চেয়ে
​​ শূন্যমনা কাঙালিনী মেয়ে?

ওর প্রাণ আঁধার যখন
​​ করুণ শুনায় বড়ো বাঁশি,
দুয়ারেতে সজল নয়ন,
​​ এ বড়ো নিষ্ঠুর হাসিরাশি।
আজি এই উৎসবের দিনে
​​ কত লোক ফেলে অশ্রুধার,
গেহ নেই,​​ স্নেহ নেই,​​ আহা,
​​ সংসারেতে কেহ নেই তার।
শূন্য হাতে গৃহে যায় কেহ
​​ ছেলেরা ছুটিয়া আসে কাছে,
কী দিবে কিছুই নেই তার,
​​ চোখে শুধু অশ্রুজল আছে।
অনাথ ছেলেরে কোলে নিবি
​​ জননীরা আয় তোরা সব,
মাতৃহারা মা যদি না পায়
​​ তবে আজ কিসের উৎসব!
দ্বারে যদি থাকে দাঁড়াইয়া
​​ ম্লানমুখ বিষাদে বিরস,
তবে মিছে সহকার-শাখা
​​ তবে মিছে মঙ্গল-কলস।


Prothom Puja Kobita Lyrics

ত্রিলোকেশ্বরের মন্দির।
লোকে বলে স্বয়ং বিশ্বকর্মা তার ভিত-পত্তন করেছিলেন
কোন্‌ মান্ধাতার আমলে,
স্বয়ং হনুমান এনেছিলেন তার পাথর বহন করে।
ইতিহাসের পণ্ডিত বলেন, এ মন্দির কিরাত জাতের গড়া,
এ দেবতা কিরাতের।
একদা যখন ক্ষত্রিয় রাজা জয় করলেন দেশ
দেউলের আঙিনা পূজারিদের রক্তে গেল ভেসে,
দেবতা রক্ষা পেলেন নতুন নামে নতুন পূজাবিধির আড়ালে–
হাজার বৎসরের প্রাচীন ভক্তিধারার স্রোত গেল ফিরে।
কিরাত আজ অস্পৃশ্য, এ মন্দিরে তার প্রবেশপথ লুপ্ত।

কিরাত থাকে সমাজের বাইরে,
নদীর পূর্বপারে তার পাড়া।
সে ভক্ত, আজ তার মন্দির নেই, তার গান আছে।
নিপুণ তার হাত, অভ্রান্ত তার দৃষ্টি।
সে জানে কী করে পাথরের উপর পাথর বাঁধে,
কী করে পিতলের উপর রুপোর ফুল তোলা যায়–
কৃষ্ণশিলায় মূর্তি গড়বার ছন্দটা কী।
রাজশাসন তার নয়, অস্ত্র তার নিয়েছে কেড়ে,
বেশে বাসে ব্যবহারে সম্মানের চিহ্ন হতে সে বর্জিত,
বঞ্চিত সে পুঁথির বিদ্যায়।
ত্রিলোকেশ্বর মন্দিরের স্বর্ণচূড়া পশ্চিম দিগন্তে যায় দেখা,
চিনতে পারে নিজেদেরই মনের আকল্প,
বহু দূরের থেকে প্রণাম করে।

কার্তিক পূর্ণিমা, পূজার উৎসব।
মঞ্চের উপরে বাজছে বাঁশি মৃদঙ্গ করতাল,
মাঠ জুড়ে কানাতের পর কানাত,
মাঝে মাঝে উঠেছে ধ্বজা।
পথের দুই ধারে ব্যাপারীদের পসরা–

তামার পাত্র, রুপোর অলংকার, দেবমূর্তির পট, রেশমের কাপড়;
ছেলেদের খেলার জন্যে কাঠের ডমরু, মাটির পুতুল, পাতার বাঁশি;
অর্ঘ্যের উপকরণ, ফল মালা ধূপ বাতি, ঘড়া ঘড়া তীর্থবারি।
বাজিকর তারস্বরে প্রলাপবাক্যে দেখাচ্ছে বাজি,
কথক পড়ছে রামায়ণকথা।
উজ্জ্বলবেশে সশস্ত্র প্রহরী ঘুরে বেড়ায় ঘোড়ায় চড়ে;
রাজ-অমাত্য হাতির উপর হাওদায়,
সম্মুখে বেজে চলেছে শিঙা।
কিংখাবে ঢাকা পাল্কিতে ধনীঘরের গৃহিণী,
আগে পিছে কিংকরের দল।
সন্ন্যাসীর ভিড় পঞ্চবটের তলায়–
নগ্ন, জটাধারী, ছাইমাখা;
মেয়েরা পায়ের কাছে ভোগ রেখে যায়–
ফল, দুধ, মিষ্টান্ন, ঘি, আতপতন্ডুল।

থেকে থেকে আকাশে উঠছে চীৎকারধ্বনি
“জয় ত্রিলোকেশ্বরের জয়’।
কাল আসবে শুভলগ্নে রাজার প্রথম পূজা,
স্বয়ং আসবেন মহারাজা রাজহস্তীতে চড়ে।
তাঁর আগমন-পথের দুই ধারে
সারি সারি কলার গাছে ফুলের মালা,
মঙ্গলঘটে আম্রপল্লব।
আর ক্ষণে ক্ষণে পথের ধুলায় সেচন করছে গন্ধবারি।

শুক্লত্রয়োদশীর রাত।
মন্দিরে প্রথম প্রহরের শঙ্খ ঘণ্টা ভেরী পটহ থেমেছে।
আজ চাঁদের উপরে একটা ঘোলা আবরণ,
জ্যোৎস্না আজ ঝাপসা–
যেন মূর্ছার ঘোর লাগল।
বাতাস রুদ্ধ–
ধোঁয়া জমে আছে আকাশে,
গাছপালাগুলো যেন শঙ্কায় আড়ষ্ট।

কুকুর অকারণে আর্তনাদ করছে,
ঘোড়াগুলো কান খাড়া করে উঠছে ডেকে
কোন্‌ অলক্ষ্যের দিকে তাকিয়ে।
হঠাৎ গম্ভীর ভীষণ শব্দ শোনা গেল মাটির নীচে–
পাতালে দানবেরা যেন রণদামামা বাজিয়ে দিলে–
গুরু-গুরু গুরু-গুরু।
মন্দিরে শঙ্খ ঘণ্টা বাজতে লাগল প্রবল শব্দে।
হাতি বাঁধা ছিল,
তারা বন্ধন ছিঁড়ে গর্জন করতে করতে
ছুটল চার দিকে
যেন ঘূর্ণি-ঝড়ের মেঘ।
তুফান উঠল মাটিতে–
ছুটল উট মহিষ গোরু ছাগল ভেড়া
ঊর্ধ্বশ্বাসে পালে পালে।
হাজার হাজার দিশাহারা লোক
আর্তস্বরে ছুটে বেড়ায়–
চোখে তাদের ধাঁধা লাগে,
আত্মপরের ভেদ হারিয়ে কে কাকে দেয় দ’লে।
মাটি ফেটে ফেটে ওঠে ধোঁয়া, ওঠে গরম জল–
ভীম-সরোবরের দিঘি বালির নীচে গেল শুষে।
মন্দিরের চূড়ায় বাঁধা বড়ো ঘণ্টা দুলতে দুলতে
বাজতে লাগল ঢং ঢং।
আচম্‌কা ধ্বনি থামল একটা ভেঙে-পড়ার শব্দে।
পৃথিবী যখন স্তব্ধ হল
পূর্ণপ্রায় চাঁদ তখন হেলেছে পশ্চিমের দিকে।
আকাশে উঠছে জ্বলে-ওঠা কানাতগুলোর ধোঁয়ার কুণ্ডলী,
জ্যোৎস্নাকে যেন অজগর সাপে জড়িয়েছে।

পরদিন আত্মীয়দের বিলাপে দিগ্‌বিদিক যখন শোকার্ত
তখন রাজসৈনিকদল মন্দির ঘিরে দাঁড়ালো,
পাছে অশুচিতার কারণ ঘটে।
রাজমন্ত্রী এল, দৈবজ্ঞ এল, স্মার্ত পণ্ডিত এল।

দেখলে বাহিরের প্রাচীর ধূলিসাৎ।
দেবতার বেদীর উপরের ছাদ পড়েছে ভেঙে।
পণ্ডিত বললে, সংস্কার করা চাই আগামী পূর্ণিমার পূর্বেই,
নইলে দেবতা পরিহার করবেন তাঁর মূর্তিকে।
রাজা বললেন, “সংস্কার করো।’
মন্ত্রী বললেন, “ওই কিরাতরা ছাড়া কে করবে পাথরের কাজ।
ওদের দৃষ্টিকলুষ থেকে দেবতাকে রক্ষা করব কী উপায়ে,
কী হবে মন্দিরসংস্কারে যদি মলিন হয় দেবতার অঙ্গমহিমা।’
কিরাতদলপতি মাধবকে রাজা আনলেন ডেকে।
বৃদ্ধ মাধব, শুক্লকেশের উপর নির্মল সাদা চাদর জড়ানো–
পরিধানে পীতধড়া, তাম্রবর্ণ দেহ কটি পর্যন্ত অনাবৃত,
দুই চক্ষু সকরুণ নম্রতায় পূর্ণ।
সাবধানে রাজার পায়ের কাছে রাখলে একমুঠো কুন্দফুল,
প্রণাম করলে স্পর্শ বাঁচিয়ে।
রাজা বললেন, “তোমরা না হলে দেবালয়-সংস্কার হয় না।’
“আমাদের ’পরে দেবতার ওই কৃপা’
এই ব’লে দেবতার উদ্দেশে মাধব প্রণাম জানালে।
নৃপতি নৃসিংহরায় বললেন, “চোখ বেঁধে কাজ করা চাই,
দেবমূর্তির উপর দৃষ্টি না পড়ে। পারবে?’
মাধব বললে, “অন্তরের দৃষ্টি দিয়ে কাজ করিয়ে নেবেন অন্তর্যামী।
যতক্ষণ কাজ চলবে, চোখ খুলব না।’

বাহিরে কাজ করে কিরাতের দল,
মন্দিরের ভিতরে কাজ করে মাধব,
তার দুই চক্ষু পাকে পাকে কালো কাপড়ে বাঁধা।
দিনরাত সে মন্দিরের বাহিরে যায় না–
ধ্যান করে, গান গায়,আর তার আঙুল চলতে থাকে।
মন্ত্রী এসে বলে, “ত্বরা করো, ত্বরা করো–
তিথির পরে তিথি যায়, কবে লগ্ন হবে উত্তীর্ণ।’
মাধব জোড়হাতে বলে, “যাঁর কাজ তাঁরই নিজের আছে ত্বরা,
আমি তো উপলক্ষ।’

অমাবস্যা পার হয়ে শুক্লপক্ষ এল আবার।
অন্ধ মাধব আঙুলের স্পর্শ দিয়ে পাথরের সঙ্গে কথা কয়,
পাথর তার সাড়া দিতে থাকে।
কাছে দাঁড়িয়ে থাকে প্রহরী।
পাছে মাধব চোখের বাঁধন খোলে।
পণ্ডিত এসে বললে, “একাদশীর রাত্রে প্রথম পূজার শুভক্ষণ।
কাজ কি শেষ হবে তার পূর্বে।’
মাধব প্রণাম করে বললে, “আমি কে যে উত্তর দেব।
কৃপা যখন হবে সংবাদ পাঠাব যথাসময়ে,
তার আগে এলে ব্যাঘাত হবে, বিলম্ব ঘটবে।’

ষষ্ঠী গেল, সপ্তমী পেরোল–
মন্দিরের দ্বার দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়ে
মাধবের শুক্লকেশে।
সূর্য অস্ত গেল। পাণ্ডুর আকাশে একাদশীর চাঁদ।
মাধব দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললে,
“যাও প্রহরী, সংবাদ দিয়ে এসো গে
মাধবের কাজ শেষ হল আজ।
লগ্ন যেন বয়ে না যায়।’
প্রহরী গেল।
মাধব খুলে ফেললে চোখের বন্ধন।
মুক্ত দ্বার দিয়ে পড়েছে একাদশী-চাঁদের পূর্ণ আলো
দেবমূর্তির উপরে।
মাধব হাঁটু গেড়ে বসল দুই হাত জোড় করে,
একদৃষ্টে চেয়ে রইল দেবতার মুখে,
দুই চোখে বইল জলের ধারা।
আজ হাজার বছরের ক্ষুধিত দেখা দেবতার সঙ্গে ভক্তের।

রাজা প্রবেশ করলেন মন্দিরে।
তখন মাধবের মাথা নত বেদীমূলে।
রাজার তলোয়ারে মুহূর্তে ছিন্ন হল সেই মাথা।
দেবতার পায়ে এই প্রথম পূজা, এই শেষ প্রণাম।


আমাদের ওয়েব সাইটে এরকমই আরও Durga Puja Kobita, Bengali Images, Paragraph পোষ্ট করা হবে। সেগুলো পেতে আমাদের ওয়েব সাইটটিকে বুকমার্ক করে রাখুন। পরবর্তীতে আরও Bengali Durga Puja 2021 নিয়ে কী পোষ্ট করা হবে সেগুলোর আপডেটস পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটিকে লাইক করে পাশে

Share This:
  • 2
    Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

close