সমাজ সংস্কারে ডিরোজিওর অবদান বা ভূমিকা (PDF)

সমাজ সংস্কারে ডিরোজিওর অবদান, সমাজ সংস্কার আন্দোলনে ডিরোজিওর ভূমিকা, PDF [ডিরোজিওর সমাজ সংস্কার আলোচনা কর, ডিরোজিওর নেতৃত্বে বাংলায় সমাজ সংস্কার আন্দোলন] (Social Reform Movement Derozio, Samaj Sanskar Derozio in Bengali)

সমাজ সংস্কারে ডিরোজিওর অবদান
ডিরোজিও সমাজ সংস্কার

ডিরােজিওর নেতৃত্বে বাংলায় সংস্কার আন্দোলন

ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ছিলেন হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরােজিও। তিনি কলকাতার এন্টালি অঞ্চলে এক ইঙ্গ-পাের্তুগিজ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ডেভিড ড্রামন্ডের ধর্মতলা অ্যাকাডেমিতে শিক্ষালাভ করেন। ডিরােজিও 1826 খ্রিস্টাব্দে মাত্র 17 বছর বয়সে হিন্দু কলেজে ইংরেজি ও ইতিহাসের অধ্যাপক নিযুক্ত হন। শিক্ষাদানের প্রতি তাঁর প্রবল উৎসাহ এবং ছাত্রদের সঙ্গে তার বন্ধুত্বপূর্ণ যােগসূত্র স্থাপন হিন্দু কলেজে একটি আলােড়ন সৃষ্টি করে। তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ইয়ং বেঙ্গল দল| তার নেতৃত্বে বাংলায় সংস্কার আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়।

1. ডিরােজিওর আদর্শ

ডিরােজিও যুক্তি দিয়ে বিচার করে সবকিছু গ্রহণ করার জন্য তার ছাত্রদের পরামর্শ দেন। তিনি তার ছাত্রদের সঙ্গে সাহিত্য, ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান, দেশপ্রেম প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়ে খােলামেলা আলােচনা করতেন। তার প্রেরণায় ছাত্ররা লক, হিউম, ভলতেয়ার, রুশাে, টম পেইন, বার্কলে প্রমুখ দার্শনিকের ভাবধারার সঙ্গে পরিচিত হন।

2. অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা

ডিরোজিওর প্রভাবে তার অনুগামী ছাত্রদের মনে স্বাধীন চিন্তা ও যুক্তিবাদের বিকাশ ঘটে। তিনি 1828 খ্রিস্টাবে মানিকতলায় ‘অ্যাকাডেমিক অ্যাসােসিয়েশন’ নামে একটি বিতর্ক সভা প্রতিষ্ঠা করেন। এই সভা জাতিভেদপ্রথা, অস্পৃশ্যতা, মূর্তিপূজা, সতীদাহ প্রভৃতির বিরােধিতা করে। এখানে ডিরোজিওর অনুগামী ছাত্ররা প্রচলিত সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে নিজেদের মতামত প্রকাশ করত| এই প্রতিষ্ঠানের মুখপত্র ছিল এথেনিয়াম।

3. পত্রিকায় প্রচার

সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ইয়ং বেঙ্গল গােষ্ঠী 1830 খ্রিস্টাব্দে ‘পার্থেনন’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। এতে নারীশিক্ষা, নারীস্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রভৃতি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। তাদের উদ্যোগে প্রকাশিত ‘ক্যালেইডোস্কোপ’ পত্রিকায় ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিরােধিতা করা হয়। এছাড়া ডিরােজিও ‘হেসপেরাস’ ও ‘ক্যালকাটা লিটারারি গেজেট’ নামে দুটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন।

4. রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে আক্রমণ

ইয়ং বেঙ্গল গােষ্ঠী হিন্দুধর্মের বক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমপ গড়ে তােলে। তারা গােমাংস খেতেন এবং ব্রাম্মণ পুরােহিতদের লক্ষ করে বলতেন, “আমরা গােমাংস খাই গাে”। তারা গঙ্গাজলের পবিত্রতা বিশ্বাস করতেন না এবং নিজেদের উপবীত ছিড়ে ফেলেন। তারা কালীঘাটের মন্দিরে মা কালীকে উদ্দেশ্য করে বলতেন, ‘মহাশয়া, প্রাতঃপ্রণাম’। তারা গঙ্গাজলের পবিত্রতা মানতেন না।

5. দেশাত্মবােধ

ডিরােজিও পাের্তুগিজ পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও তিনি ছিলেন মনেপ্রাণে ভারতীয়। তার লেখা ‘ফকির অব জঙ্গিরা’ ও ‘ভারতবর্ষ, আমার স্বদেশের প্রতি’ কবিতায় এদেশের প্রতি তার দেশপ্রেম ফুটে উঠেছে।

6. সামাজিক আলােড়ন

ইয়ং বেঙ্গলদের হিন্দুধর্ম-বিরােধী সংস্কার আন্দোলন সমাজে তীব্র আলােড়ন ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। হিন্দু কলেজের বহু ছাত্রের অভিভাবক আশঙ্কিত হন যে, ডিরােজিওর ভাবধারা তাদের সন্তানের ক্ষতি করবে। এজন্য তারা তাদের সন্তানদের অন্য কলেজে সরিয়ে নিতে থাকেন। শেষপর্যন্ত ডিরোজিওকে অভিযুক্ত করে হিন্দু কলেজের কর্তৃপক্ষ তাকে পদচ্যুত করে। এর কিছুকাল পর 1831 খ্রিস্টাব্দে মাত্র 22 বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়।

আরো পড়ুন – সমাজ সংস্কারে রাজা রামমোহন রায়ের ভূমিকা বা অবদান

1 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.

close