Bangla Bhuter Golpo ‘পার্বতী’ – নতুন বাংলা ভূতের গল্প (2022)

বাংলা ভূতের গল্প নতুন, সত্যি ভূতের গল্প, দেখতে চাই, শোনাও, দেখাও [Bangla Bhuter Golpo 2022, Horror Story In Bengali] (Vuter Golpo PDF Download, Bhayankar Bhooter Golpo Chai)

Bhuter Golpo
Bhuter Golpo 2022
গল্পপার্বতী
লেখকসজীব মাহমুদ নীল

“ও প্রতিশোধ নিবেই সাহেব, সবাইকে শেষ করে দিবে। কাউকে বাঁচিয়ে রাখবে না।”
কথাগুলো বলতে বলতে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসলো বৃদ্ধের ভেতর থেকে।

গ্রামের পথ ধরে মিনিট দশ পনেরো হাঁটলে পাহাড়ের গায়ে লেপ্টে থাকা যে পাকা দালান চোখে পড়ে এটাই এখানকার একমাত্র মন্দির। যদিও বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় পাহাড়ের খাঁজ কেটেই তৈরি করা হয়েছে মন্দিরটাকে, কিন্তু এর আসল ইতিহাস ভিন্ন। ১৮০০ শতাব্দীর দিকে তৈরি করা এই মন্দিরের ইতিহাস বড়ই বিচিত্র।

যদিও এই আশ্চর্য জিনিসটা কে বা কারা তৈরি করেছে সে সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাওয়া যায়নি কখনোই, তবুও লোকমুখে যতটা শোনা যায় তার সারমর্ম এই, “সে সময়ে দাক্ষিণাত্যে ছোট বড় রাজার অভাব ছিলো না। যে কেউ নিজেকে রাজা হিসাবে ঘোষণা করতো। যদিও তাদের লোক বল ছিলো খুবই কম তবুও তারা রাজা। আর ঠিক সেই সময়ে ডাকাত দলের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিলো বহু গুনে। আর সেসব ডাকাত দলের একমাত্র লক্ষ্য ছিলো এইসব ছোট ছোট রাজ্য।

কোনো কোনো ডাকাত দলের লোকবল আর ক্ষমতা এতটাই বেশি ছিলো যে যা কোনো ছোট খাটো রাজার থেকে কম নয়। আর তাই রাজারা সেসব ডাকাত দলের থেকে নিজেদের ধন সম্পদ রক্ষার জন্য বিভিন্ন ধরণের গুপ্ত কুঠির নির্মান করতেন। এটাও তেমনই একটা গুপ্ত কুঠি। অনেকের ধারণা এখানে রাজা তার নিজের সকল ধন সম্পদ লুকিয়ে রাখার জন্যই তৈরি করেছিলেন, আর তারপর চারিদিকে মাটি দিয়ে ঢেকে দিয়েছিলেন এই কারণে যেনো যে কেউ এটাকে পাহাড় বলে ভুল করে।

Bhuter Golpo

তিনি কতটুকু সফল হয়েছিলেন সেটা বলা শক্ত কারণ পরবর্তীতে অনেক খুঁজেও তেমন কিছুই কেউ পায়নি। তারপর একটা সময় এটাকে এখানকার মন্দির হিসাবে ব্যবহার করা হয় । এই মন্দিরটাকে নিয়ে আরও একটা কথা রটে মুখে মুখে, তবে সেটার কোনো ভিত্তি নেই। অনেকের ধারণা এই জায়গাটাকে নাকি গুপ্ত কুঠি নয় বরং তন্ত্র চর্চার জন্যই তৈরি করা হয়েছিলো। এর কারণ হলো এখানে অনেকগুলো গুপ্ত কুঠির খোঁজ পাওয়া গেছে। সব কক্ষেই আলাদা আলাদা মূর্তি, যার নাম এবং পূঁজোর ধরণ সবারই অজানা।

সেই সাথে দেয়ালে আঁকা রয়েছে নানান ধরণের সাংকেতিক চিহ্ন। একটা সময় হয়তো এসবের কোনো অর্থ থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু এখন আর বোঝার কোনো উপায় নেই। কেবল মন্দিরের জায়গাটা বাদে, বাকি সব ঘর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সে সব ঘরে আর কেউ যায় না।

তেমনই একটা গোপন কক্ষে বসে আছেন দুইটা মানুষ। একজন বৃদ্ধ, তার ঠিক সামনেই হাঁটু গেড়ে বসে আছে একটা বছর সতেরো আঠারোর একটা মেয়ে। বৃদ্ধের আচরণ স্বাভাবিক হলেও সামনে বসে থাকা মেয়েটি কাঁদছে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। কি যেনো একটা বলছে সামনে বসে থাকা বৃদ্ধকে। আর বলতে বলতে বার বার হাতদুটো জড়ো হয়ে আসছে বুকের কাছটায়। আর হাতদুটো যতক্ষণ বুকের সামনে থাকে ততক্ষণ পাশে রাখা টিমটিম করে দুলতে থাকা প্রদীপের আলোয় ধরা দিচ্ছে মেয়েটির হাতের কজ্বির একটু নিচের ক্ষতটা। কেউ যেনো কামড়ে খুবলে তুলে নিয়েছে মাংস।

বেশ কিছুক্ষণ এমনটা চলার পর আবারও দুইটা হাত জোড়ো হয়ে আসলো বুকের কাছটায়। একটু পর একটা হাত নেমে গেলেও আরেকটা হাত কিন্তু নামলো না। বরং বুকের কাছ থেকে হাতটা ধীরে ধীরে উঠে আসতে লাগলো গলার কাছটায়। আর আসতেই প্রদীপের লাল আলোয় দেখা গেলো চকচক করতে থাকা জিনিসকে। মেয়েটি এতক্ষণ মুঠো করে এই ছোট্ট ছুরিটাকেই ধরে রেখেছিলো শক্ত করে।

হাতটা গলার কাছে আসতেই কান্নার গতি খানিকটা বেড়ে গেলো যুবতীর। কাঁপাকাঁপা হাতে ছোট অস্ত্র টা গলার কাছটায় নিয়ে গেলো সে। বিড়বিড় করে কী যেনো একটা বললো। আর তারপরই ছুরিটা চালিয়ে দিলো নিজেরও গলা লক্ষ্য করে । আর চালাতেই ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসতে লাগলো তাজা রক্তের ধারা। মেয়েটি আর বেশিক্ষণ হাঁটু ভেঙে বসে থাকতে পারলো না, একটা ধপ শব্দে কাত হয়ে পড়লো মেঝেতে। প্রদীপের লাল আলোটা এবার সরাসরি পড়েছে সদ্য ইহলোক থেকে মুক্তি পাওয়া মেয়েটির মুখের উপর।

সেই মুখে কোনো ব্যথার ছাপ নেই। বরং দেখে মনে হচ্ছে এটাই যেন চাচ্ছিলো সে। চিরমুক্তি। আশ্চর্যের বিষয় এই যে চোখের সামনে এতবড় একটা ঘটনা ঘটে যেতে দেখেও বিন্দু মাত্র বিচলিত হলো না বৃদ্ধ। বরং আগে ঠিক যেমন ভাবে বসে ছিলো, এখনও ঠিক কেমন ভাবেই বসে রইলো একই জায়গায়।

গুপ্ত কুটিতে যখন এমন ঘটনা ঘটছিলো ঠিক তখন একমাত্র পুরোহিতকে দেখতে না পেয়ে পূজো দিতে আসা লোকজনের মনে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। পুরোহিত মশাই যে মাঝে মধ্যেই ভেতরের গোপন কুটিতে গিয়ে বসে থাকেন এটা সবারই জানা। কিন্তু আজ এতক্ষণ সময় পার হওয়ার পরও যখন পুরোহিত ফিরলো না তখন সবাই একটু আশ্চর্যই হলো। তার বয়স হয়েছে, বলা তো যায় না হয়তো মাথা ঘুরে পড়ে যেতে পারে। অথবা কোনো বিপদই হলো না তো? পুরোনো আমলের অন্ধকার সব কামরা।

সাপ পোকা মাকড় থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। কোনো বিপদ হয়নি তো? এইসব নানান ভাবনা চিন্তা কয়েকজন লোক ভেতরে গেলো। এ ঘর ওঘর ঘুরে ঘুরেও যখন পুরোহিতের কোনো দেখা পেলো না তখন ফিরতেই যাবে কিন্তু হঠাৎ-ই একজন চিৎকার করতে করতে বেরিয়ে আসলো একটা ঘর থেকে। লোকটা যেখান থেকে বেরিয়ে আসলো সেখানে যে কোনো ঘর আছে বা থাকতে পারে সেটাই কেউ জানতো না। জানার কথাও নয়। কারণ ঐখানটায় তো ইটের দেয়াল তোলা।

Horror Story In Bengali

সবাই দৌড়ে যখন সেখানে গেলো তখন চোখের সামনে এমন বিভৎসতা দেখে রক্ত হিম হওয়ার জোগাড়। মন্দিরের একমাত্র পুরোহিত বিচিত্র এক ভঙ্গিমায় বসে আছেন বেদির উপর আর উনার ঠিক সামনেই পড়ে আছে একটা নারীদেহ। রক্তে পুরো মেঝে ভিজে উঠেছে ততক্ষণে। এতগুলো লোক যে গুপ্ত দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে তাতেও কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই বৃদ্ধের। সেই এক ভাবে বসে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন মেঝেতে পড়ে থাকা মেয়েটির দিকে। মুখে কোনো কথা নেই, কিন্তু তাতে কী? চোখের সামনে এমন নারকীয়তা দেখে আসল ঘটনাটা বুঝতে খুব বেশি অসুবিধে হবার কথা নয়। হলোও না।

এতদিন যে মানুষটাকে ঈশ্বরের জায়গায় রেখে সবাই পূঁজো করেছে আজ তাকেই এই অবস্থায় দেখে রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়লো সবাই। পুরোহিত হয়েছেন তো কী হয়েছে? তাই বলে তিনি একজন মেয়েকে এইভাবে বলি দিবেন? আর সেটা সবাই নিজের চোখে দেখেও চুপ করে থাকবে? এটা তো হতে পারে না। মৃত্যুদণ্ডই তার আসল শাস্তি, কিন্তু তবুও তিনি সম্মানী ব্যক্তি রাগের মাথায় কোনো কিছু করা ঠিক হবে না। ঘটনা যা বোঝার সেটা তো পরিষ্কার , কিন্তু তবুও হুট করেই তো কিছু করা যায় না। শাস্তি যে তাকে পেতেই হবে সেটা তো আর নতুন করে বলে দিতে হয় না, কিন্তু গ্রামে পঞ্চায়েত আছে। যা শাস্তি দেওয়া সেখানেই না হয় দেওয়া হবে। তার আগে এই মৃত দেহটাকে তো কোনো ব্যবস্থা করতে হবে।

বাবস্থা হলো, যদিও মেয়েটাকে কেউই চিনে না। জানে না জাত পাতের হিসাব। তবুও মেয়েটি যেহেতু গ্রামের মন্দিরে এসেছে আর পুরোহিতের সাথে দেখা করেছে তাই হিন্দু হওয়ার সম্ভবনায় বেশি থেকে যায়। আর তাই নিয়ম অনুযায়ী গ্রামের শ্মশানেই দাহ করা হলো দেহটাকে। কিন্তু এবার পুরোহিতের কী করা যায়? এত বড় অপরাধের পর ক্ষমার কোনো প্রশ্নই আসে না। হোক সে পুরোহিত তাই বলে কী যা খুশি তাই করবেন? তাছাড়াও এইভাবে তাকে ছেড়ে দিলে হয়তো ভবিষতে এর থেকেও বড় কোনো কিছু করবেন।

যে মানুষটাকে এতদিন ঈশ্বরের আসনে বসিয়ে পূঁজো করেছে লোকজন তাকে নিয়েই এবার নানান কথা রটতে শুরু করলো। কেউ বললো, পুরোহিত যে মন্দিরের ভেতরে যান তার কারণ হলো তিনি তন্ত্র মন্ত্রের চর্চা করেন। কেউ কেউ তো আবার চরমে পৌঁছে গেলো, পুরোহিত যেহেতু বিয়ে শাদি করেননি তাই হয়তো মেয়েটাকে দিয়ে কোনো কু কাজ করানোর জন্যই এনেছিলেন, কিন্তু মেয়েটি যখন সেই কাজে রাজি হলো না তখন নিজেকে বাঁচানোর জন্য মেরে ফেলেন। এ ছাড়াও আরও বেশ কিছু কথা রটলো। অবশেষে বিচার বসলো। কিন্তু পুরোহিতের মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হলো না। অগত্যা রায় হলো, রক্তের বদলে রক্ত।

পুরোহিত যে ভাবে মেয়েটাকে মেরেছে ঠিক সেই ভাবেই তাকেও মারা হোক। সবাই সে কথায় মতও দিলো। দিন আর লগ্ন ঠিক করে যেই ঘরে মেয়েটার মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিলো ঠিক সেই ঘরেই নিয়ে যাওয়া হলো পুরোহিতকে। সাথে কয়েকজন মানুষ আর একজন জল্লাদ। যে এক কোপে ধড় থেকে আলাদা করে দিবে পুরোহিতের মাথাটা। কার্য সম্পাদন করা হলো। আর করেই সবাই মিলে বন্ধ করে দিলো ঘরটাকে, চিরদিনের জন্য। আর তারপরই একটা মতভেদের সৃষ্টি হলো, সবাই বলতে শুরু করলো যেখানে ঐ পুরোহিত বসে পূঁজো পাঠ করতো সেই মন্দিরে আর কেউ পূঁজো করবে না।

তাহলে উপায়? ঠিক হলো মন্দির যেমন আছে থাকুক, কিন্তু তার পাশেই আরেকটা নতুন মন্দির তৈরি করা হোক সেখানেই সবাই নতুন করে পূঁজো শুরু করবে। যেই ভাবা সেই কাজ। নতুন মন্দির হলো, নতুন পুরোহিত আসলো। সব কিছু আবারও আগের মত চললেও, কানে একটা কথা ভেসে আসে মাঝে মাঝেই। যদিও আগের মন্দিরটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তবুও একটা সময় তো সেখানে দেবীর পূঁজো হতো তাই মাঝে মধ্যেই পরিষ্কার করার জন্য দুইজন লোক মন্দিরের দরজা খুলে।

তারপর ঝাড়ু দিয়ে আবারও তালা লাগিয়ে দেয়। আর যারা এই কাজ করে তারা নাকি মাঝে মাঝে দুইজন মানুষের কথার আওয়াজ শুনতে পায় । একটা মেয়ে কাউকে করুণ মিনতি করছে। কথাগুলো যদিও ভাঙা ভাঙা তবুও যে টুকু বোঝা যায় কেউ মেয়েটি করুণ স্বরে বলছে,

” প্রতিশোধ নিও, আজ না হোক কাল, কিংবা তারও পর দশ বছর পর হলেও প্রতিশোধ নিও।”

প্রতি উত্তরে ভেসে আসে আরেকটা বৃদ্ধের কণ্ঠস্বর, তবে সে যে ঠিক কী বলে সেটা বোঝা যায় না।

বাংলা ভূতের গল্প

প্রতিদিনের মত আজও মেয়েটাকে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো হিমাংশু। আর দেখতেই গাড়ির গতি খানিকটা কমিয়ে দিলো। এর কারণ মেয়েটাকে চিনে সে। সে যে ফ্ল্যাটে থাকে তার ঠিক পাশের ফ্ল্যাটেই থাকে মেয়েটা। নাম নিয়তি। যদিও কথা খুব একটা হয় না তবুও যেটুকু হয়েছে তাতেই বড্ড ভালোবেসে ফেলেছে মেয়েটাকে। আর ভালো বাসবেই না-ই বা কেনো? এমন মেয়েকে ভালো না বেসে পারা যায়? কিন্তু কখনো সে সব কথা বলার সাহস হয়নি হিমাংশুর। তবে ঠিক করেছে চাকুরির প্রমোশনটা হলেই কথাটা বলবে নিয়তিকে। তারপর নিয়তি যদি রাজি হয় তবে প্রেম আর নয় একেবারে ঘরে তুলে নিবে মেয়েটাকে। গাড়িটা থামাতেই আজ হাসি মুখেই এগিয়ে আসলো নিয়তি। বললো,

হিমাংশু দা, একটু নামিয়ে দিবেন? রিক্সায় যেতে ভালো লাগছে না।

হিমাংশু নিয়তিকে নিজের মনের কথা বলতে না পারার আরেকটা কারণ হলো, মেয়েটাকে তাকে হিমাংশু দা বলে সম্বোধন করে। যা মোটেও ভালো লাগে না ওর। সে চায় নিয়তি তাকে শুধু মাত্র হিমাংশু বলে ডাকুক। তাছাড়া বয়সই বা কত ওর? এই তো এবার আটাশে পড়লো। নিয়তির কথা শুনে হিমাংশু একটু হেসে বললো,

অবশ্যই, এসো উঠে বসো।

ঠোঁটের কোণে একটা হাসির রেখা ফুটিয়ে গাড়ির দরজা খুলে উঠে বসে নিয়তি। আর বসতেই হিমাংশুর ভেতরটা কেমন যেনো করে উঠলো। এর আগে নিয়তিকে বেশ কয়েকবার বলেও লিফট দিতে পারেনি সে। প্রতিবারই বলেছে, এই তো রিক্সা পেয়ে যাবো। আপনি যান হিমাংশু দা।

ফিরে এসেছে হিমাংশু। কিন্তু আজ নিয়তি নিজেই বললো নামিয়ে দিতে? বুকের ভেতর কেউ যেনো হাতুড়ি পিটছে হিমাংশুর। গলাটা শুকিয়ে আসছে বার বার।

আজ দেখলাম না যে?

প্রশ্ন করলো নিয়তি। যার অর্থ অবশ্য হিমাংশু বুঝলো না। হা করে তাকিয়ে থাকলো লুকিং গ্লাসটার দিকে। নিয়তি একটু হেসে বললো,

আমি জানি, তুমি আমাকে দেখার জন্য গেটের কাছটার দোকানটায় এসে দাঁড়াও। তারপর একটা সিগারেট নাও। তারপর ততক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকো যতক্ষণ আমি থাকি।

সে ভুল শুনছে না তো? নিয়তি তাকে তুমি করে বলছে? না ভুল শোনার কথা তো নয়। হ্যাঁ এটা সত্যি, অফিসে আসার সময় একটু আগেই নিজের ফ্ল্যাট থেকে বের হয় সে। তারপর গেটের কাছটার দোকানে এসে দাঁড়ায় যেখান থেকে নিয়তির বেলকনিটা খুব ভালো করে দেখা যায়। আর সেখানেই প্রতিদিন সদ্য স্নান করে এসে দাঁড়ায় নিয়তি। তোয়ালে দিয়ে ভেজা চুল মুছে। যদিও এটা খুব বেশি সময়ের জন্য নয়, তবুও এই কয়েক মিনিটের জন্য সারারাত অপেক্ষা করে হিমাংশু। কিন্তু এটা নিয়তি জানলো কীভাবে? তবে কী সেও তাকে দেখে? ঠিক যেমন হিমাংশু নিজে লুকিয়ে দেখে নিয়তিকে। বুকটা আবারও ধড়াস করে উঠে হিমাংশুর। গলাটা আবার শুকিয়ে আসে। আমতা আমতা করে বলে,

ঘুম ভাঙ্গেনি।

উত্তরে খিলখিল করে হেসে উঠে নিয়তি।

ভাঙ্গবে কী করে? কাল তো অর্ধেক রাত বাইরেই ছিলে। আমি দেখেছি। হিমাংশু দা?

এতক্ষণ তো ঠিকই ছিলো, কী দরকার ছিলো আবার এই দা বলাটা? মেয়েরা এমনই হয় বুঝি। হিমাংশু কোনো উত্তর দিলো না। তার কী অভিমান থাকতে নেই? একটা মেয়েকে সে পাগলের মত ভালোবাসে, এটা জেনেও তাকে দাদা বলতে হবে কেনো? বড্ড অভিমান হতে লাগলো ওর। কিন্তু স্থায়িত্ব পেলো না খুব বেশি, কারণ পিছনের সিট থেকে একটা হাত এসে ছুঁয়েছে ওর কাঁধ। আর ছুঁতেই পুরো শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেলো হিমাংশুর। আর সেই সাথে দ্বিতীয় বারের মত বুকের ভেতর ধড়াস করে উঠলো।

তোমাকে দাদা বলি বলে খুব অভিমান করো তাই না? বেশ আজ থেকে আর বলবো না।

প্রতিউত্তরে কোনো কথা বলতে পারলো না হিমাংশু। পুরো শরীর ঘামছে। সব কথাগুলো যেন আটকে গেছে গলার ঠিক মাঝখানটায়। হাতের স্টিয়ারিংটা কোনো মতে ধরে রেখেছে, যদিও গাড়ির গতি কমিয়ে দিয়েছে, তবুও এই ধীর গতির গাড়িটাও যেনো তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে। নিজের মনকে শক্ত করার চেষ্টা করে হিমাংশু । নিয়তি আবার বলে উঠে,

রোজ রোজ গেটের কাছটায় দাঁড়িয়ে না থেকে সোজা আমার কাছে চলে যেতে পারো তো তাই না? আমি কী তোমাকে নিষেধ করতাম। তুমি কী আসতে চাও?কিন্তু তাহলে তো তোমাকে একটা কাজ করতে হবে। পারবে তুমি?

কী কাজ?

কথাটা বলতে গলাটা কয়েকবার থরথর করে কেঁপে উঠে হিমাংশুর। নিয়তির আলিঙ্গনের মাত্রা বেড়েই চলেছে। হিমাংশু জানে এই অবস্থায় গাড়ি চালালে যে কোনো মূহর্তে কোনো দূর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে, তাই গাড়িটাকে রাস্তার ধারে রাখার কথা ভাবতেই নিয়তি আবারও বললো,

উহু, গাড়ি থামানো যাবে না। তাহলে তো পৌঁছাতে দেরি হয়ে যাবে। তুমি কী চাও দেরি করতে?

Bangla Bhooter Golpo

গাড়ি থামানো হলো না হিমাংশুর। নিয়তির হাত দুটো তোলপাড় করছে ওর কাঁধে আর বুকে। এতক্ষণ নিজের মন আর শরীরের উত্তেজনায় বিষয়টা লক্ষ্য করেনি সে। এখন খানিকটা হুস ফিরতেই বুঝতে পারলো, আর সেটা হলো নিয়তির হাতদুটো কেমন যেনো ঠান্ডা। আর তার থেকেও বড় কথা, মানুষ যেভাবে আঙ্গুল বুলায় এটা ঠিক তেমন নয়, হাতের আঙ্গুলগুলো যেনো আঙ্গুল নয়, ছোট ছোট সাপ। যা তার শার্টের ভেতর অবধি পৌঁছে গেছে। চমকে উঠলো হিমাংশু, আর তখনই চোখ গেলো লুকিং গ্লাসে। আর তাকাতেই আঁতকে উঠলো, বুকের রক্ত হিম হয়ে গেলো হিমাংশুর। এ কে? যাকে এতক্ষণ সে নিয়তি ভেবে এসেছে এ তো সে নয়। বলতে গেলে কোনো মানুষই নয়। যেনো কোনো এক অতল গহ্বর থেকে উঠে এসেছে একটা প্রেত। চেহারাটা ভরে উঠেছে অসংখ্য কালো কালো দাগে। খুলে রাখা চুলগুলো যেনো ছাড়া পাওয়া ছোট বড় মাঝারি সাপের মত কিলবিল করে এগিয়ে আসছে তারই দিকে। আর চোখ? যে চোখে সে নিজেকে দেখতে চেয়েছে সবসময় ? চেয়েছিলো নিয়তির ছুটতে থাকা চোখ দুটো যেনো ওকেই খোঁজে। সেই চোখ কোথায়? এতো কেবল দুটো গর্ত যেখানে বাসা বেধেছে দুইটা কালো কুচকুচে সাপ।

কে তুমি? কে কে?

ভয়ে আতঙ্কে কথাগুলো বলে উঠে হিমাংশু। আর তাতেই খিলখিল করে হেসে উঠে নিয়তি থেকে বদলে পাওয়া প্রেতমূর্তিটা। একটু আগের মিহি কণ্ঠটা এবার বদলে যেতে থাকলো। অতল গহ্বর থেকে কেউ বলে উঠলো,

কী হলো হিমাংশু, ভয় পেলে বুঝি? উঁহু ভয় পেলে তো চলবে না। তোমাকে আমার কাছে আসতে হবে। তুমিও তো সেটাই চাও। তাই না? তাহলে এখন ভয়ে চলবে কেনো?

ছাড়ো আমাকে, ছাড়ো। আমি চাই না তোমার কাছে যেতে। ছাড়ো বলছি।

গাড়ির গতি কোনো এক অদৃশ্য হাতের ইশারায় বেড়ে চলে। আর সেই সাথে পুরো শরীরে কিলবিল করতে থাকে হাতের আঙ্গুলগুলো। ভয়ে আতঙ্কে দিশাহারা হয়ে একবার আর্তনাত বেরিয়ে আসলো হিমাংশুর মুখ থেকে। কিন্তু আর্তনাত যেনো চাপা পড়ে গেলো পিছনের সিটে বসে থাকা প্রেতমূর্তির হাসির নিচে। চোখ দুটো ক্রমেই বুজে আসতে শুরু করলো হিমাংশুর। ধীরে ধীরে সব কিছু যেনো চোখের সামনে মিলিয়ে যেতে লাগলো। আর গেলোও তাই।

স্যার আসবো?

পুলিশ স্টেশনে নিজের ডেস্কে বসে আজকের খবরের কাগজটা পড়ছিলেন ইন্দ্রনীল স্যানাল। প্রশ্নটা শুনে মাথা তুলে তাকালেন, এবং একজন পুলিশের উর্দি পরা লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললেন,

আসুন, আসুন।

অনুমতি পেয়ে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করলেন পুলিশ কর্মকর্তাটি। তারপর সামনে সাজিয়ে রাখা দুইটি চেয়ারের একটি টেনে বসতে বসতে বললেন,

স্যার, মৃত ব্যক্তি সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়ে যা জানতে পারলাম তার নাম হিমাংশু দেবনাথ। কলকাতার একটা কোম্পানিতে কাজ করেন। আত্মীয় বলতে কেউ নেই এখানে, সে একাই থাকতো। বিয়ে শাদি করেনি।

এক্সিডেটের কারণ জানতে পেরেছেন?

রিপোর্ট অনুযায়ী, হার্টফেল। অথচ লোকটির হার্টের কোনো সমস্যা ছিলো না।

তাহলে?

হঠাৎ কিছু দেখে ভয় পেয়েই হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে যায়, আর তাতেই গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন।

ড্রিংকিং ড্রাইভিংয়ের কোনো কেস?

না স্যার, নেশা করতেন না। তেমন কোনো রিপোর্টও নেই। তার পরিচিত লোকজনের সাথে কথা বলে যা জানতে পারলাম সেটা হলো সাধারণ গোছের মানুষ ছিলেন এই হিমাংশু।

তাহলে আর কী, বন্ধ করে দিন কেসটা।

ঠিক আছে স্যার।

কথাটা বলে পুলিশ অফিসারটি উঠতেই যাচ্ছিলেন কিন্তু কী যেনো একটা মনে করে আবার বসে পড়লেন। বললেন,

স্যার, অফিস থেকে ফেরার পথে এক জায়গায় এসে নাকি হিমাংশু বাবু দাঁড়াতেন। তারপর একজনের সাথে কথা বলতেন। গতকালও দাঁড়িয়েছিলেন।

তো? কারও সাথে কথা বলা তো আর অন্যায় নয়।

না স্যার আসলে, সেখানেই কয়েকটা দোকান আছে। তাদের সাথে আমার কথা হয়েছে আর কথা বলে যা বুঝলাম একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো সেখানে, তিনি তার সাথেই কথা বলতেন। কালকেও দাঁড়িয়েছিলেন, কারও সাথে একটা কথা বলেছিলেন। অথচ সেখানে কেউই ছিলো না।

ছিলো না? তাহলে কার সাথে কথা বলেছিলেন?

জানি না স্যার। তবে দোকানদারটা যা বললো তা হলো, প্রায়ই একটা মেয়ের সাথে দাঁড়িয়ে কথা বললেও গতকাল নাকি মেয়েটি আসেনি, কিন্তু হিমাংশু বাবু দাঁড়িয়েছিলেন, গাড়ির ভেতর থেকে গলা বাড়িয়ে হেসে কথাও বলেছিলেন।

সামনে বসে থাকা অফিসারের কথায় খানিকটা ভ্রু কুঁচকে গেলো ইন্দ্রনীল স্যানালের।

কি সব বলছেন? কেউ ছিলো না অথচ লোকটি কথা বলেছিলো? সেটাও আবার হেসে হেসে?

জ্বী স্যার।

এমনটা হয় না। দোকানদার হয়তো ভুল দেখেছে।

আমারও তেমনটাই মনে হয়েছিলো। কিন্তু পাশের দোকানদারও যখন একই কথা বললো তখন একটু খটকা লাগলো। তাই ভাবলাম আপনাকে বলি।

মেয়েটা কে?

জানি না, তারাও বলতে পারলো না। তবে পাশেই যে কোম্পানিটা আছে, মেয়েটা নাকি সেখানেই কাজ করে।

বাদ দিন তো, এটা যে খুন নয় সেটা তো বোঝায় যাচ্ছে। বন্ধ করে দিন কেস। আর হ্যাঁ, মৃতদেহ নিতে কেউ আসলে, আমার কাছে পাঠিয়ে দিবেন। রিপোর্ট এসেছে?

জ্বী, আমি আপনাকে কালকেই মেইল করে দিয়েছি।

ঠিক আছে।

আর কোনো কথা বললেন না তিনি। বেরিয়ে গেলেন রুম থেকে।

ফোনটা বেশ কিছুক্ষণ ধরেই ভাইব্রেট করছে। সুনিন্দ্র বার বার অবনীকে বলেছে একবার কল করার পর রিসিভ না করলে আর যেনো না করে, অফিসে অনেক কাজ থাকে। তাছাড়া অফিস টাইমে বউয়ের সাথে কথা বলার জন্য কোম্পানি তাকে মাইনে দেয় না। কিন্তু না, কে শোনে কার কথা। একবার ফোন করা শুরু করলে যতক্ষণ পর্যন্ত রিসিভ না করছে ততক্ষণ থামাথামির কোনো নামই নেই। আজও একপ্রকার বিরক্ত হয়েই ফোন রিসিভ করতে হলো সুনিন্দ্রকে । আর রিসিভ করে নিজে কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে ভেসে আসলো অবনীর কণ্ঠ।

Vuter Golpo 2022

শোনো, দাদা এসেছে। বলছে কয়েকদিন যেনো ঘুরে আসি। কাল তো রবিবার, মেয়ের স্কুল ছুটি। পরশু ফিরবো। চাবি পাশের ফ্ল্যাটের ভাবীর কাছে রেখে গেলাম। রান্না করা আছে, তো…

সুনিন্দ্র জানে, ফোন যদি এখনই না কাটে তাহলে কথা আর শেষ হবে না। তাই সবটা শোনার আগেই কলটা কেটে দিলো। যাক, ছুটির দিনটা অন্তত ঘুমানো যাবে। অবনী থাকলে সেটার উপায়ই বা কই। বিয়ের এত বছর হলো তবুও তার ছেলে মানুষী যেনো কমতে চায় না। এখানে নিয়ে চলো ওটা এনে দেও সেটা করবো। বলি এখন সে নিজেই বাচ্চার মা, এই অবস্থায় তার এমন ছেলে মানুষী চলে? না চলে না। কথাটা তিক্ত হলেও সত্য।

অফিস থেকে ফিরে বাসায় এসে লকে হাত রাখতেই খুলে গেলো দরজাটা। খানিকটা অবাকই হলো সে। এমনটা তো হওয়ার কথা ছিলো না। অবনী তো দরজা খুলে রাখার মানুষ না। তাছাড়া সে তো বলেও দিয়েছে চাবিটা যেনো নিয়ে আসে। যদিও এখন সেটার ইচ্ছে করছে না একদমই। তাছাড়া তার কাছে তো একটা ডুপ্লিকেট চাবি আছেই। তবে কী দরজা লক করতে ভুলে গেছে অবনী? হতে পারে। কিন্তু না ভুল অবনী করেনি। কারণ দরজা খোলার শব্দ শুনে মেয়েটা সিড়ি বেয়ে নেমে তার দিকেই আসছে।

তবে কী তারা যায়নি?

বাবা, তুমি এসেছো?

হ্যাঁ মা, তোমরা নানুবাড়ী যাওনি?

মা গিয়েছে।

সে কি, অবনী তো বললো মেয়েকেও নিয়ে যাবে। তাহলে? বেশ রাগ হলো সুনিন্দ্রের, এতটুকুন একটা বাচ্চাকে একা একা রেখে এভাবে কেউ যায়? বলি বুদ্ধিসুদ্ধি কিছু নেই নাকি? সুনিন্দ্রের ইচ্ছে করছিলো এখনই ফোন করে বেশ কিছু কথা শুনিয়ে দেয়। কিন্তু তা, তেমনটা করলো না সে। সবে মাত্র অফিস থেকে ফিরেছে। এখন ফোন করলে রাগের মাথায় যা ইচ্ছে তাই বলে ফেলবে। তার চেয়ে বরং পরে ফোন করা যাবে।

রাত আটটা পেরিয়ে গেলেও অবনী কিন্তু ফোন করলো না। আশ্চর্য হলো সুনিন্দ্র। একে তো মেয়েটাকে এভাবে একা রেখে গেছে তার উপর একবার ফোন করেও খোঁজ নেওয়া প্রয়োজন মনে করলো না? না এবার আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না সে। তবে হ্যাঁ, মেয়ের কথা সে নিজে বলবে না। সে দেখতে চায় অবনী কখন জিজ্ঞেস করে।

দুইবার রিং হতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসলো অবনীর কণ্ঠস্বর।

বেশ কিছুক্ষণ কথা বলার পরও যখন অবনী মেয়ের কথা জিজ্ঞেস করলো না তখন মনটা একটু দমেই গেলো ওর। অথচ সে জানতো মেয়েকে ছাড়া সে এক মুহুর্তও থাকতে পারে না। কিন্তু তাই যদি হবে তাহলে আজ অবনীর এমন আচরণের কারণ কী? মেয়েটা কোলেই বসে ছিলো সুনিন্দ্রের। একটা স্নেহের হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলো মেয়ের মাথায়। আর ঠিক তখনই নজর গেলো বাচ্চা মেয়েটির হাতের কজ্বির দিকে। আর যেতেই বললো,

এখানে কী হয়েছে তোমার? দাগ কিসের?

মেয়ে কিন্তু কোনো কথা বললো না, চলতে থাকা টিভির দিকে তাকিয়ে রইলো এক দৃষ্টিতে । সুনিন্দ্র ততক্ষণে মেয়ের হাতটা নিজের হাতে তুলে ভালো করে দেখা শুরু করেছে। একটা কামড়ের দাগ। ক্ষতটাও এখনো শুকায়নি।

কী হলো বলো, আমাকে আগে বলোনি তো।

আর তখনই ওপাশ থেকে ভেসে আসলো অবনীর কণ্ঠ।

এই তুমি কার সাথে কথা বলছো বলোতো? তোমার সাথে কে আছে এখন?

অবনীর এমন কথায় তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে সুনিন্দ্র। একে তো মেয়েকে এভাবে একা রেখে গেছে, তার উপর মেয়ের হাতে এতবড় একটা ক্ষতের কথা তাকে একবারও বলার প্রয়োজন মনে করেনি। একবার জানতেও চাইলো না মেয়েটা খেয়েছে কিনা, ঘুমিয়েছে কিনা।

কে আছে মানে? দেখো অবনী এবার তোমার ছেলে মানুষীটা একটু কমাও। মেয়েকে রেখে গেছো ভালো কথা। একবার তো আমাকে বলতে পারতে, এতক্ষণ ধরে কথা বলছি একবার খোঁজ নিয়েছো? হ্যাঁ? আর ওর হাতে কি হয়েছে? ঘা তো এখনো শুকাওনি, কই কাল তো এমনটা ছিলো না।

সুতপা তোমার কাছে? কি বলছো এইসব? ওকে তো আমি নিয়েই এসেছি। আর ওর হাতে কী হবে? কী বলিনি তোমাকে? সুনিন্দ্র তুমি ঠিক আছো তো?

কথাগুলো শুনে অবাক হয়ে গেলো সুনিন্দ্র। অবনী মিথ্যে বলেনি, মায়ের মুখে নিজের নাম শুনে ওপাশে কথা বলছে মেয়েটা। কিন্তু তাই যদি হবে তাহলে এতক্ষণ তার কোলে এ কে বসে আছে।

হ্যালো, হ্যালো, তুমি ঠিক আছো তো? হ্যালো……

কোনো উত্তর দেয় না সুনিন্দ্র। কারণ, এতক্ষণ যে বাচ্চা মেয়ের হাতটি ধরে ছিলো সেটা এখন ধীরে ধীরে সাদা থেকে কালো হতে শুরু করেছে। আর সেই সাথে ক্ষতটা উঠছে আরও দগদগিয়ে। হাতের নখগুলো ধীরে ধীরে সাপের মত লম্বা হয়ে যেনো ঢেউ খেলতে আরম্ভ করেছে । সবচে বড় কথা হলো, এতক্ষণ সে যে বছর ৬-৭ এর বাচ্চাকে কোলে নিয়ে ছিলো এটা তো সে নয়। বরং ধীরে ধীরে সেটা বড় হতে শুরু করেছে। ভয়ে আর আতঙ্কে শিউরে উঠলো সুনিন্দ্র। এক ঝটকায় মেঝেতে ফেলে দিলো জিনিসটাকে। আর দিতেই দেখলো জিনিসটা কিন্তু মেঝেতে পড়লো না, বরং ভেসে রইলো শূন্যে। আর সেই সাথে সাপের মত কিলবিল করতে লাগলো খোলা চুলগুলো। চোখের কোটর থেকে বেরিয়ে আসছে কালো কুচকুচে দুইটা সাপ। শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত নেমে গেলো সুনিন্দ্রের।

কে তুমি? কী চাও?

প্রশ্নটা শুনে খিলখিলিয়ে হেসে উঠে প্রেতমূর্তি। সেই সাথে মুখের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে লিকলিকে কালো কুচকুচে জিহ্বাটা। কারও জ্বিহ্বা কী এত বড় হতে পারে? কিন্তু পরক্ষণেই ভুল ভেঙে যায় ওর। যে জিনিসটাকে সে এতক্ষণ জ্বিহ্বা ভেবে ভুল করেছিলো সেটা আসলে একটা কালো কুচকুচে সাপ। যা এখন তারই চারদিক ঘুরাঘুরি করছে, দুলছে বাতাসে। আর দেখতে দেখতে কিছু একটা বোঝার আগেই ছোবল মারলো বুকে, অসহ্য যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠলো সে। বেশ কিছুটা মাংস তুলে নিয়েছে, আর সেই ক্ষত দিয়ে ফিনকি দিয়ে বইছে রক্তের ধারা। আর সেটা দেখে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো প্রেতমূর্তিটি। হাওয়ায় ভেসে এগিয়ে আসলো কাছে, খুব কাছে। প্রেতের হাড়হিম করা ঠাণ্ডা নিঃশ্বাস মুখের উপর পড়ছে। সেই সাথে পুরো শরীর যেনো কেঁপে কেঁপে উঠছে কিছুর ছোঁয়ায়।

গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হচ্ছে না, লিকলিকে হাতের আঙ্গুল গুলো ততক্ষণে তার শার্টের নিচে চালিয়ে যাচ্ছে নিজেদের নৃত্য। আহ্, কী সেই অমানবিক নির্যাতন। যেনো পুরো শরীরের মাংস খুবলে নিচ্ছে হাতগুলো। চোখের কোটর থেকে বেরিয়ে আসা কালো কুচকচে সাপদুটো হাওয়ায় দোল খেতে লাগলো, আর পরক্ষণেই ঢুকে গেলো সুনিন্দ্রের ভয়ে হা করে থাকা মুখের ভিতর। গলা দিয়ে কিলবিল করে নেমে যেতে লাগলো নিচের দিকে। আর তারপরই নিজেদের অবস্থান জানান দিতে বেরিয়ে আসলো পেট ফুঁড়ে। আর সেই সাথে দেহের সব শক্তি সঞ্চয় করে গলা ফেটে বেরিয়ে আসলো একটা আর্তচিৎকার। তারপর সব কিছু আগের মতই নিস্তদ্ধ।

পরেদিন সকালে অবনী যখন ফিরলো তখন দেখলো দরজা বাইরে থেকে লক করা। চাবি দিয়ে লক খুলে ঘরের বেডরুমের দিকে গেলো সে। যদিও তার ফেরবার কথা ছিলো সোমবার কিন্তু রাতের স্বামীর এমন আচরণে সেটা আর সম্ভব হলো না। বেডরুমে ডুকেই শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেলো। আর সেই সাথে গলা ফেটে বেরিয়ে আসলো একটা আর্তনাদ। সেই সাথে জ্ঞান হারালো অবনী। কতক্ষণ পর জ্ঞান ফিরলো জানে না, কিন্তু যখন জ্ঞান ফিরলো তখন দেখলো সে শুয়ে আছে হাসপাতালের বেডে। আর তার পাশে বসে আছে দুইজন মহিলা পুলিশ। তার ঠিক কী হয়েছিলো সেটা মনে করার একটা চেষ্টা চালাতেই ভেসে উঠলো সকালের দেখা ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় বিছানায় পড়ে থাকা সুনিন্দ্রের দেহটা। আবারও জ্ঞান হারালো সে। এইভাবে বেশ কয়েকবার ঘটলো।

Bangla Bhuter Golpo

আপনি তো তাদের প্রতিবেশী। রাতে কোনো আওয়াজ শোনেননি?

পুলিশ কর্মকতার প্রশ্নে মাথা নাড়লেন সামনের সোফাতে বসে থাকা ভদ্রলোক। তারপর বললেন,

আসলে ফ্ল্যাটগুলো সাউন্ড প্রুভ। ভেতরের আওয়াজ বাইরে শোনা যায় না।

কিন্তু লক তো বাইরে থেকে লাগানো ছিলো। তাকে নিশ্চয় লক খুলেই ভেতরে ঢুকতে হতো? তাই নয় কি? কিন্তু তেমনটা তো ঘটেনি।

জানি না।

মৃতদেহটাকে পোষ্ট মর্টামের জন্য পাঠিয়ে অদম্য পাল বাড়ির কেয়ারটেকারের কাছে গেলেন জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। লক যেহেতু বাইরে থেকে লাগানো সেহেতু দুইটা সন্দেহ জাগে মনে। এক, সুনিন্দ্রের স্ত্রী নিজেই স্বামীকে হত্যা করেছেন, আর দুই, এমন কেউ হত্যাটা করেছেন যে কিনা তাদের পরিচিত। খুন করার পর বাইরে থেকে লক করে দিয়ে পালিয়ে যান। কিন্তু না, দুইটার একটাও যুক্তিসম্মত হলো না। সিসিটিভি ফুটেজ সব গোলমাল করে দিলো। সেখানে দেখা গেলো, অবনী যাওয়ার অনেক পর বাসায় আসেন সুনিন্দ্র। আর সে লক খুলেই ভেতরে ঢুকেন। বাইরে থেকে লক করতে আর কাউকে দেখা যায়নি। অগত্যা একটা ধোঁয়াশা নিয়েই ফিরতে হলো অদম্য পালকে।

রিপোর্ট আসলো রাতের দিকে। সেখানে কী লেখা থাকবে সেটা আগে থেকেই জানা। আর সেটা হলো শরীরের জায়গায় জায়গায় ক্ষতের চিহ্ন। পেটের উপর দুইটা গভীর ক্ষত। কোনো গোল অথচ ধারালাে কিছু ঢুকানো হয়েছে পরপর দুইবার। কিন্তু নাহ্, রিপোর্টে তা লেখা ছিলো না। আর যেটা লেখা ছিলো সেটা দেখে চোখ কপালে উঠবার জোগাড়। এটা কীভাবে সম্ভব? রিপোর্টটা পড়েই কাউকে ফোন করলেন অদম্য পাল।

হ্যালো, রিপোর্ট টা পড়ছিলাম। আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে না তো? মানে এটা তো একেবারেই অসম্ভব।

না , ভুল হচ্ছে না। আমি নিজেও এটা ভেবে অবাক হচ্ছি। এটা কীভাবে সম্ভব হলো। কিন্তু বার বার পরীক্ষা করার পরও রিপোর্ট এটাই এসেছে। কিন্তু…

পেটে কিছু ঢুকানো হয়নি, বরং ভেতর থেকে বের করা হয়েছে। এটাই সত্য। আর হ্যাঁ, শরীরের আচড়ের ক্ষতগুলো সম্পর্কেও এটাই নির্ভূল রিপোর্ট। কোনো কিছুতে খুবলে নিয়েছে শরীরের মাংস। সেই সাথে দাঁত দিয়েই তৈরি করেছে এইসব ক্ষত। তবে জিনিসটা ঠিক কি সেটা বোঝা যায়নি। বোধহয় বোঝা যাবেও না। তবে আমি যদি নতুন করে কিছু পাই তবে জানাবো।

ফোনটা কেটে যায় ওপাশ থেকে। অদম্য পাল মুহ্যমানের মত বসে রইলো চেয়ারে হেলান দিয়ে। একটা মানুষকে এমন নৃশংস ভাবে খুন করা হলো অথচ কোনো প্রমাণ না রেখে? আর ডাক্তার যে কথাটা বললো সেটাই বা হয় কীভাবে? পেটে কোনো জিনিস না ঢুকিয়ে বের করা যায় কী? হিসাব মিলাতে পারে না অদম্য পাল।

স্যার, একজন মৃতদেহ নিতে এসেছে।

তার স্ত্রী?

আজ্ঞে না স্যার। বয়স্ক মতন একটা লোক।

পাঠিয়ে দেও।

কিছুক্ষণ পর যে মানুষটা ঘরে ঢুকলো তাকে বৃদ্ধ বলাটাই বোধহয় ভালো। শরীর ভেঙে পড়েছে বহু আগেই। কয়েকদিনের না কামানো খোঁচাখোঁচা দাঁড়িযুক্ত চেহারায় শোকের ছাপ স্পষ্ট । চোখ ঢুকে গেছে কোটরে।

বসুন। আপনি মৃতের কে হোন?

আজ্ঞে বাবু আমি অমল প্রসাদ। হিমাংশু বাবুদের বাড়ির দেখাশোনা করি। দেবনাথ বাবু অসুস্থ, বিছানা থেকে উঠতে পারে না। তাই আমাকেই পাঠালো।

আচ্ছা ঝামেলায় পড়া গেলো তো। এই হিমাংশু টা আবার কে? প্রশ্ন করলেন অদম্য পাল।

এই হিমাংশু টা কে?

ছোট বাবু । সুনিন্দ্র বাবুর ভাই।

তিনি এলেন না যে।

আসবেন কীভাবে বাবু, তিনি তো বেঁচে নেই।

বেঁচে নেই?

আজ্ঞে না, কিছু দিন আগে মারা গেছে। কলকাতায় থাকতেন।

বৃদ্ধের কথায় ভ্রু কুঁচকে গেলো অদম্য পালের। ছোট ভাই মরার কিছুদিন পর বড় ভাইয়ের খুন? ভারী অদ্ভুত তো।

আর কেউ নেই?

আজ্ঞে না বাবু, দেবনাথ বাবুর বংশে বাতি দেওয়ার মত আর কেউ রইলো না। কেবল থাকার মধ্যে বড় বাবু। তারও সময় এলো বলে। মেয়েটি ঠিকই বলেছিলো, সবাইকে শেষ করে দিবে। কাউকে বাঁচিয়ে রাখবে না।

ভূতের গল্প 2022

কোনো মেয়েটি? আর এই যে হিমাংশু লোকটা কলকাতার কোথায় থাকতেন? আর তার মৃতদেহ নিশ্চয় আপনিই নিয়ে গিয়েছিলেন?

কেউ না কেউ না,দেহটা দিন আমি চলে যাই।

অদম্য পাল আর কোনো প্রশ্ন করলেন না। লোকটা যে কিছু একটা লুকানোর চেষ্টা করছে সেটা তো বোঝায় যাচ্ছে। কিন্তু সেটা কী? যদিও প্রশ্ন করার অধিকার আইনগত ভাবেই আছে কিন্তু এমতাবস্থায় কোনো প্রশ্ন করা যুক্তিসংগত হবে না। তাই যথাযথ প্রমাণ নিয়ে মৃহদেহ লোকটির হাতে তুলে দিলেন।

অমল প্রসাদ মৃতদেহটা নিয়ে চলে গেলে কলকাতা পুলিশ স্টেশনে একটা ফোন করলেন অদম্য পাল।

হ্যালো, কলকাতা পুলিশ?

জ্বী হ্যাঁ বলছি।

আচ্ছা কিছুদিন আগে আপনাদের ওখানে একজন খুন হয়েছিলো নাম হিমাংশু দেবনাথ। তার বিষয়ে জানার জন্যই ফোন করলাম।

হিমাংশু দেবনাথ, খুন নয় রোড এক্সিডেন্টে মারা গিয়েছে। কিন্তু আপনি কে?

আমি বিধান নগর পুলিশ স্টেশন থেকে ইন্সপেক্টর অদম্য পাল বলছি। তার যে একজন ভাই ছিলো জানতেন?

জ্বী হ্যাঁ, তার ভাই এসে মৃতদেহ নিয়ে যান। সাথে অবশ্য আরেকজন এসেছিলেন। কেনো বলুন তো?

তার ভাই খুন হয়েছে। আর হ্যাঁ, ফোনে নয়,আমি কলকাতা আসছি। কেনো জানি মনে হচ্ছে দুইটা ঘটনা এক সূত্রে বাঁধা। ছাড়ছি।

কথাগুলো বলে ফোনটা রেখে দেয় অদম্য পাল। কিন্তু ওপাশে থাকা ইন্দ্রনীল স্যানালের মাথায় তখন অনেকগুলো চিন্তা এক সাথে ঘুরতে শুরু করেছে।

শিবনাথ বাবুকে বলবেন আমি ডেকেছি।

কথাটা বলেই নিজের ডেস্কে ফিরে গেলেন ইন্দ্রনীল স্যানাল। একটু পর যখন শিবনাথ নামে পুলিশ কর্মকতাটি আসলেন তখন বললেন,

আপনার হিমাংশু দেবনাথের কেসটা মনে আছে? কি যেনো বলছিলেন? কারও সাথে কথা বলেছিলো তাই না? আপনি কী পরে আর কোনো খো্ঁজ নিয়েছেন?

তেমন ভাবে তো নয়, তবে হিমাংশু লোকটা কার জন্য দাঁড়াতেন সেটা খোঁজ নিয়েছি। মেয়েটার নাম নিয়তি , হয়তো ভালোবাসতেন। কিন্তু মেয়েটির সাথে কথা বললে সে জানায় যে তেমনটা কিছুই ছিলো না। হিমাংশু নাকি প্রায় লিফট দিতে চাইতেন, আর সে কারণেই দাঁড়াতেন। এমনকি বাসার গেটের সামনেও নাকি দাঁড়িয়ে থাকতেন। কিন্তু তিনি যেদিন মারা যায় সেদিন নাকি মেয়েটির ছুটি হতে দেরি হয়েছিলো। আর তাই দেখা হয়নি।

কথাগুলোর সত্যতা সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছেন?

হ্যাঁ স্যার, মেয়েটি সত্য বলেছে। কিন্তু কেনো বলুন তো?

ভদ্রলোকের বড় ভাই খুন হয়েছে।

দিন তিনেক পর যখন কলকাতার পুলিশ স্টেশনে অদম্য পাল আসলেন তখন ইন্দ্রনীল আর শিবনাথ দুইজনই উপস্থিত ছিলো। অদম্য পাল রিপোর্টগুলো ভালো করে দেখে বললেন,

আচ্ছা, মৃতদেহ যখন নিয়ে যাওয়ার জন্য এসেছিলেন তখন কোনো মেয়ের কথা বলতে শুনেছেন?

মেয়ে? কই না তো তবে হ্যাঁ, হিমাংশু একটা মেয়েকে বোধহয় ভালোবাসতেন। যদিও আমরা তার সত্যতা খুজে পাইনি। মেয়েটার নাম নিয়তি। তার সাথে কথা বলে তেমন কোনো আভাস পাওয়া যায়নি। তাছাড়াও, মৃত্যুটা যেহেতু এক্সিডেন্টে হয়েছে, তাই তাকে সন্দেহ করার কোনো কারণ দেখিনি।

মেয়েটার বিষয়ে কোনো খোঁজ খবর নিয়েছেন? মানে মেয়েটা কী করে, কোথায় থাকে, গ্রাম ইত্যাদি বিষয়ে?

হুমমম নিয়েছি, তবে সন্দেহের কিছুই নেই।

সে তো বুঝলাম কিন্তু আমার অনুমান এই দুইটা মৃত্যুর পিছনে একটা কিছুর হাত তো আছেই। আপনি কী করবেন জানি না তবে আমার কেসটা যেহেতু খুনের তাই তদন্তের জন্য সুনিন্দ্র বাবুর গ্রামে একবার যাবো। আপনি চাইলে আমার সাথে যেতে পারেন।

কবে যাবেন? আজই?

হ্যাঁ, আমার মনে হয় আরও কিছু ঘটতে চলেছে। তাই হাতে সময় বেশি নেই।

আজ তো বিকাল হয়ে এসেছে। এক কাজ করলে কেমন হয়? কাল সকালে যদি যাওয়া হয় তাহলে?

বেশ তো। তবে তাই হোক।

পর পর দুই ছেলের এমন মৃত্যুতে একেবারেই ভেঙে পড়েছেন দেবনাথ মিশ্র। শরীর তো ভেঙে পড়েছিলোই সেই সাথে চলার শক্তিটাও হারিয়ে ফেলেছেন বছর দশেক হলো। কিন্তু তবুও মনের দিকে কিছুটা হলেও শক্ত ছিলেন, কিন্তু আর সেই শক্তিটাও হারিয়ে গেলো। নিজের অবস্থা এতটাই বেহাল যে দুই ছেলের শেষকৃত্যতেও পাশে থাকতে পারেননি, এটাই কী কম দুঃখ? অথচ তিনি তো এমনটা চাননি, ছেলেরা যেনো ভালো থাকে সেই জন্যই তো দুইজনকে দুই শহরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তাতেই কী শেষ রক্ষা হলো? হলো না, মেয়েটার কথায় সত্যি হলো। বংশে বাতি দেওয়ার মত পুরুষ বলতে আর কেউই রইলো না।

এইসব কথা ভাবতে ভাবতে বুকটা হুহু করে উঠলো দেবনাথ মিশ্রের। এমনটা তো হওয়ারই কথা ছিলো, পাপ করেছিলেন তিনি। শাস্তি তো পেতেই হবে। কিন্তু তাই বলে এতটা? নাকি এটাও কম? একে একে সব হারিয়েছেন তিনি, এখন আর হারানোর মত আছেই বা কী? কিন্তু তবুও মৃত্যু যেনো তাকে দেখে মুখ টিপে হাসে দূরে দাঁড়িয়ে , ধরা দিতে চায় না। কিন্তু তিনি তো চান মৃত্যু আসুক। আর কত সহ্য করা যায়? ক্ষমতা তো অনেক আগেই গিয়েছে, স্ত্রীও হারিয়েছে। অর্থ যা ছিলো সেটাও এখন তলানিতে। থাকার মধ্যে রইলো কেবল এই বাড়িটা। সেটাও বা থেকে কী লাভ হয়েছে? হয়নি তো। চোখটা জলে ভিজে আসে দেবনাথ মিশ্রের।

হঠাৎ শুয়ে শুয়ে তিনি অনুভব করলেন তার বড্ড শীত করছে। এখন তো শীতকাল নয়, গরমের সময়। তবুও শীত শীত করছে কেনো? জানালা তো লাগানোই আছে। অমল টা যে কই গেলো, যদিও গায়ে একটা চাদর সব সময়ই দেওয়া থাকে কিন্তু তার উপর একটু কাঁথাটা টেনে দিতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু ডাকবেন যে তারই বা ক্ষমতা কই? সেটাও তো হারিয়ে ফেলেছেন সেই কবেই। তিনি কথা যে একেবারেই বলতে পারেন না তেমনটা নয় পারেন, তবে সেটা বোঝবার জন্য মুখের কাছে কান আনা চাই। দেখতে দেখতে পুরো শরীর হিম হয়ে আসলো দেবনাথ মিশ্রের। আর পরক্ষণেই কাঁপুনি দিতে লাগলো শরীরটা।

এতটা শীত কেনো লাগছে? আর বাতাসটা যেনো ডান দিক থেকে আসছে। ঘাড় ফিরে ডান দিকে তাকালেন দেবনাথ মিশ্র। আর তাকাতেই প্রথমে বুকটা ধক করে উঠলো তার। কারণ তার ঠিক শিয়রে বসে আছে একটা মেয়ে। আর তার চেয়েও বড় কথা মেয়েটাকে তিনি চিনেন। মেয়েটাকে চিনতে পারতেই আঁতকে উঠলেন তিনি। ভয়ে শরীর কাঁপতে শুরু করলো। কিন্তু পরক্ষণেই ভয়টা যেনো উবে গেলো। আর তার পরিবর্তে মুখে একটা ম্নান হাসির রেখা ফুটে উঠলো।

এসেছো তুমি? জানতাম তুমি আসবে। কিন্তু এতটা দেরিতে বুঝতে পারিনি। যাক এসেছো যখন ভালোই হয়েছে, এবার তবে মুক্তি।

ফিসফিসে কণ্ঠের কথাগুলো এতটাই আস্তে শোনালো যে সন্দেহ জাগে পাশে বসে থাকা মেয়েটির কানে তা পৌছালো কিনা।

মুক্তি? কার মুক্তি? মুক্তি দিতে আসিনি তো আমি। শুধু বলতে এসেছি, আমি আমার কথা রেখেছি।

হুমম তা রেখেছো। পাপ করেছি, শাস্তি পাচ্ছি। আমার সব কিছু কেড়ে নিয়েছো তুমি, এবার আমাকেও নাও।

তোমাকে সেদিন কী বলেছিলাম মনে নেই? একবার মনে করে দেখো।

অতীত ঘাটতে একেবারেই ইচ্ছে করে না দেবনাথ মিশ্রের, কিন্তু এবার মনে করার চেষ্টা করলেন।

পনেরো বছর আগে এই মেয়েটিই বলেছিলো কথাগুলো, “আমি তোমার জীবনে যা বয়ে নিয়ে আসবো সেটা মৃত্যুর থেকেও বেশি ভয়ংকর। বার বার তুমি চাইবে মৃত্যু তোমার কাছে আসুক, কিন্তু আসবে না সেই মৃত্যু। মরলে তো তুমি মুক্তি পেয়ে গেলে। তা হতে দিবো না। তোমাকে বেঁচে থাকতে হবে, ততদিন পর্যন্ত যতদিন না তোমাকে দেখার কেউ অবশিষ্ট থাকবে। “

এখন কেউ নেই আমার, মেরে ফেলো আমাকে।

Bhuter Golpo In Bangla

মেয়েটা উঠে দাঁড়ায় বিছানা থেকে। আর দাঁড়াতেই করুণ মিনতির সুর ভেসে উঠে দেবনাথ মিশ্রের কণ্ঠে,

শোনো, যেও না। আমাকে মুক্তি দেও। আমি মরতে চাই।

বৃদ্ধের এমন করুণ আকুতি পৌঁছায় না মেয়েটির কান পর্যন্ত। হাউ মাউ করে ডুকরে কেঁদে উঠে দেবনাথ মিশ্র। কান্নার বেগে খানিকটা দুলে উঠে শরীরটা , আর তাতেই দেহে পঁচে যাওয়া শরীরে বাসা বাঁধা পোকাগুলোর যেনো ঘুম ভেঙে যায়। শুরু করে তাদের অভিযান। অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠে দেবনাথ মিশ্র। দরদর করে অশ্রু ঝরে দুই চোখের কোণ বেয়ে, মুখে উচ্চারিত হয়, আমাকে মুক্তি দাও। মৃত্যু দাও আমাকে। মৃত্যু দাও।

পুলিশের গাড়িটা যখন গ্রামে এসে পৌঁছালো তখন দুপুর হয় হয়। একজনকে বলতেই মিশ্র বাড়িটা দেখিয়ে দিলো। অমল প্রসাদ নামের বৃদ্ধ ভৃত্য বাইরেই কাজ করছিলো। পুলিশের গাড়ি দেখে খানিকটা ইতস্তত করেই এগিয়ে গেলো সেদিকে। ততক্ষণে তিনজন পুলিশ অফিসার গাড়ি থেকে নেমে এসেছে।

প্রণাম বাবু। ভেতরে চলুন।

তিনজনের উদ্দেশ্যেই হাত জোড়ো করলো অমল প্রসাদ।

ভেতরে যাবো কিন্তু তার আগে তোমাকে কিছু প্রশ্ন করার আছে। দেখো সেদিন কথাটা এড়িয়ে গেলেও আজ কিন্তু পারবে না। কারণ সেদিন আমি মানবতার খাতিরে কিছু বলিনি, আজ কিন্তু ছাড় দিবো না। যদি সত্যিটা না বলো তাহলে তোমার উপরও কিন্তু আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। হাতে বেশি সময় নেই তাই সরাসরিই বলে দিলাম। এবার বলো সেদিন তুমি কোন মেয়ের কথা বলেছিলে।

সেদিনের অমন শান্ত আর মিষ্টি ভাষী অফিসার যে আসা মাত্রই এমন চড়াও হয়ে উঠবে এমনটা হয়তো ভাবেনি অমল প্রসাদ। আর তাই খানিকটা ভড়কেই গেলো সে। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসলো বৃদ্ধের ভেতর থেকে। বললেন,

বেশ তবে শুনুন, পাপ করেছিলো সাহেব। ঘোরতর পাপ করেছিলো। আর পাপ মানুষের পিছু ছাড়ে না। চলুন ঐখানটা বসে সব বলছি।

এই কথায় অবশ্য আপত্তি করলেন না কেউই। কারণ যা মনে হচ্ছে তাতে ঘটনাটা বেশ লম্বা। অমল প্রসাদ এতক্ষণ যেখানে বসে কাজ করছিলো সেখানেই গিয়ে বসলেন সবাই। খানিকটা সময় নিলো অমল প্রসাদ। হয়তো পুরো ঘটনাটা গুছিয়ে নিতেই এমন নীরবতা। অবশেষে বলতে শুরু করলাে।

“অনেক দিন আগের কথা। নারায়ণ মিশ্রের প্রভাব দশ গ্রাম জুড়ে। আর তাই কোনটা ভুল আর কোনটা ঠিক সেই হিসাব করে কিছু করতেন না। যা ভালো লাগতো তাই করতেন। একবার ভেবেও দেখতেন না। তিনিই যেহেতু এই গ্রামের মাথা তাই তার বাড়িতে কাজের লোকের হিসাব ছিলো না। হরিনাথ তাদেরই একজন ছিলো। বেশ ভালো লোক, সৎও বটে। কিন্তু হঠাৎ-ই একদিন ভেতর বাড়ি থেকে একটা সোনার থালা চুরি হয়ে গেলো। পূজোর থালা। তো যারা কাজ করতো সবার বাড়িতেই খোঁজ চালানো হলো, কিন্তু জিনিসটা পাওয়া গেলো না জানেন। কি আর করার, সামান্যই তো একটা জিনিস। তাই সেটা নিয়ে আর কোনো কথা উঠলো না।

কিন্তু হঠাৎ করে একজন তান্ত্রিক মতন লোক আসলো। নারায়ণ মিশ্র এইসব লোকদের খুব আদরে রাখতেন। কেনো রাখতেন জানি না। তো কথায় কথায় নাকি সেই তান্ত্রিক বললো, তিনি নাকি অনেক কিছু জানেন। এমন কী হারানো জিনিসও নাকি বের করে দিতে পারেন তার মন্ত্র বলে। তো নারায়ণ মিশ্র ভাবলেন তাকে একবার পরীক্ষা করেই দেখা যাক। পরীক্ষা করা হলো, সেটা ভুল হলো নাকি সঠিক হলো সেটা অবশ্য জানা গেলো না কিন্তু চোর ধরা পড়লো। হরিনাথ। হরিনাথ অবশ্য বলেছিলো সে চুরি করেনি, কিন্তু কে শোনে কার কথা। বিচারের রায় হলো , চুরির শাস্তি হাত কেটে দেওয়া। কিন্তু তেমনটা হলো না। চোর যেহেতু স্বীকার করেনি তাই শাস্তিটাও দ্বিগুন আর সেটা হলো গ্রামে সবচেয়ে বড় গাছের সাথে ফাঁসি। এমনটা করার কারণ হলো আর যেনো কেউ ভুলেও এই কাজ করার সাহস না পায়। হলোও তাই। “

মানে একটা মানুষকে সামান্য পূজোর তালা চুরির দায়ে ঝুলিয়ে মারা হলো? অথচ সে বলছে চুরি সে করেইনি।?

তাই তো হলো সাহেব। কেউ প্রতিবাদ করেনি, বরং সবাই এমনটাই চেয়েছিলো।

শুনে গা শিউরে উঠলো অদম্য পালের। এ কেমন কথা? চুরির প্রমান নেই সাক্ষী নেই অথচ একটা তান্ত্রিকের কথায় লোকটাকে মেরে ফেলা হলো? হায় ঈশ্বর, এমন মানুষও দুনিয়ায় আছে?

তারপর?

তবে হ্যাঁ, পরে অবশ্য জানা গিয়েছিলো চুরিটা হরিনাথ করেনি, নারায়ণ মিশ্রের দুই ছেলে তখন ছোট, খেলতে খেলতে লুকিয়ে রেখেছিলো। পরে আর মনে করতে পারেনি। ভয়ে কাউকে বলতেও পারেনি। কিন্তু যা হবার তা তো হয়েই গেছে। এখন আর এইসব ভেবে কাজ কী। চোরের বউ বাচ্চাকে কেউ ভালো চোখে দেখে না সাহেব। হরিনাথের তখন একটা দুইটা ছেলে আর একটা মেয়ে। ছেলে দুইটা অবশ্য ছোট, কিন্তু মেয়েটা যুবতী। বিয়ের কথা চলছিলো। বিয়েটা ভেঙে গেলো। সেই সাথে গ্রামের লোক করে দিলো একঘরে।

Bengali Real Horror Story

কেনো? সে যে চুরি করেনি সেটা তো পরে সবাই জানলোই তাহলে?

যদি তেমনটা করা হতো তাহলে নারায়ণ মিশ্রের দুই ছেলেকে দোষ দিতে হয়। সেটা তো আর লোকে করবে না। তাই…..

তারপর?

অপমান আর লজ্জা সহ্য করতে না পেরে দুই ছেলেকে নিয়ে বউটা কুয়োই ঝাপ দিলো। মেয়েটাকে নিতে পারেনি, বাড়িতে ছিলো না। থাকলে হয়তো হরিনাথের বউ এটা করতে পারতো না।

মেয়েটা নারায়ণ মিশ্রের কাছে আসেনি?

এসেছিলো তো।

তারপর?

মেয়েটা এসে বললো সবটা। শুনে নারায়ণ মিশ্র বলেছিলো বিয়ে যখন ভেঙে গেলো তখন না হয় তিনিই করবেন বিয়ে।

এটা নিশ্চয় সবাই জানে না

না সাহেব, জানে না। তবে আমি আগে থেকেই তার কাছের লোক। আমি সবই জানি।

তারপর?

মেয়েটার সাথে নাকি জোরও করেছিলো। একা থাকলে হয়তো মেয়েটার শক্তিতে পেরে উঠতো না নারায়ণ মিশ্র। কিন্তু কী বলবো সাহেব লজ্জার কথা, মেয়ে হয়ে মেয়ের এমন সর্বনাশ কেউ করে? গিন্নি মা ছিলো সাথে। গিন্নি মা নাকি বলেছিলো, এবার যা সবাইকে গিয়ে বল এইসব কথা। মেয়েটি অবশ্য কাউকেই কিছু বলেনি। তবে হ্যাঁ, গাঁয়ের মধ্যে ভরা মজলিশে বলেছিলো,

“এর প্রতিশোধ আমি নিবো। হয় আজ নয়তো কাল দশ বছর পর হলেও নিবো।”

মেয়েটা বলেছিলো, “এর প্রতিশোধ আমি নিবো। হয় আয় নয়তো কাল, এমনকি দশ বছর পর হলেও নিবো।”

এর পর আর মেয়েটিকে কেউ দেখেনি সাহেব । কোথায় চলে গেছে কেউ জানে না।

প্রতিশোধ নিয়েছিলো?

এখনো তো নিয়েই যাচ্ছে সাহেব।

সেই ঘটনার এক মাসের মাথায় ভরা ধানের গোলায় আগুন ধরলো। সেকি আগুন! পানি দিলে আগুন আরও বেশি জ্বলে এমনটা কখনো শুনেছেন? আমরাও শুনিনি, কিন্তু সেদিন দেখেছিলাম। গ্রামের সবাই তো বটেই নারায়ণ মিশ্র নিজেও সেই আগুনে পানি ঢালতে লাগলো। আর তখনই পুড়লো পা। প্রথমে ভেবেছিলো সেরে যাবে। সেরেও গেলো, কিন্তু কে জানতো ভেতরে ভেতরে ঘা থেকেই যাবে। বছর ঘুরতেই আবার ক্ষত বাড়লো। কবিরাজ বললো, পা যদি কাটা না হয়, তাহলে পুরো শরীরে ছড়িয়ে যাবে। কী আর করার, একটা পা গেলে যাক, অন্তত বেঁচে তো থাকবেন। পা কাটা হলো, কিন্তু সুরাহা কিছু হলো না।

ততদিনে বাকি পায়েও ছড়িয়ে গেছে ঘা। কত ডাক্তার কত কবিরাজ দেখানো হলো, কেউ সারাতে পারলো না। চিকিৎসায় পিছনে কাড়িকাড়ি টাকা ঢালতে লাগলো, কিন্তু না কোনোই লাভ হলো না। সবার একই কথা এই পাও কেটে ফেলতে হবে। কী আর করার কাটা হলো। কিন্তু ততদিনে সম্পদ শেষের পথে, আর সেটাও বছর তিনেকের মাথায়। ভাবা যায়? আর এমনই যখন অবস্থা তখন হঠাৎ-ই গিন্নি মাকে নিজেরই ঘরে পাওয়া গেলো মৃত অবস্থা। বীভৎস সেই মৃতদেহ, পুরুষ মানুষ তো দেখতে পারেনি কিন্তু যে মহিলারা দেখেছে তাদের অনেকেই দেখা মাত্রই মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলো।

এই ঘটনার পর সবার মুখে মুখে একটা কথায় বলে শোনা গেলো আর সেটা হলো হরিনাথের মেয়ে বলেছিলো প্রতিশোধ সে নিবেই। যদি তাই না হবে তাহলে হঠাৎ এমনটা হবে কেনো? এছাড়া তো আর কোনো কারণ দেখছে না কেউ। নারায়ণ মিশ্রও হয়তো বুঝেছিলেন, আর তাই দুই ছেলেকে শহরে পাঠিয়ে দিলেন। এর পর আর একবারও গ্রামে আসতে দিলেন না। ততদিনে পায়ের ঘা ছড়িয়ে পড়েছে পুরো শরীরে। তাই সাথে শরীরের ক্ষত উঠলো বিষিয়ে। একটা সময় পোকা দিতে শুরু করলো।

আশ্চর্যের বিষয় এই যে এই সবই হয়েছে গলার নিচ পর্যন্ত। একটা সময় ডাক্তার কবিরাজ মুখ ফিরিয়ে নিলো। বলতে গেলে চিকিৎসা করানোর আর কোনো রাস্তায় খুঁজে পেলেন না ওরা। কত ক্ষমতা, সম্পদ, গায়ের জোর, লোক বল সম্মান সবাই কিনা বছর পাঁচেকের মধ্যেই সব শেষ হয়ে গেলো? তবুও একটা কথা ভেবে একটা শান্তি পেতেন তিনি, আর সেটা হলো ছেলে দুটো ভালো আছে। সব যাই যাক ছেলেগুলো ভালো থাকুক। কিন্তু সেটাও যখন হারিয়ে গেলো তখন আর বেঁচে থেকে কী করবেন বলুন? কিন্তু মরতে চাইলেই কী মরা যায়? সবই ভগবানের হাতে।

কথাগুলো বলতে বলতে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো অমল প্রসাদ।

এর পরের ঘটনাটা তো সবাই জানেন অদম্য পাল আর ইন্দ্রনীল স্যানাল। তাই সেগুলো আর জিজ্ঞেস করলেন না। কেবল একটা কথায় জিজ্ঞেস করলেন,

মেয়েটার নাম কী ছিলো জানো?

অনেক দিন আগের কথা তো, তবে পার্বতী নামের কিছু একটা। কেনো বলুন তো।

পরে আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি?

নাহ্ তবে এর কিছুদিন পর একটা কথা যে কানে আসেনি তেমনটা নয়। এসেছিলো। তবে সেটা কতটা সত্য জানা যায়নি।

কি ঘটনা?

এখান থেকে বেশ কিছু দূর পরের গ্রাম গৌড়ী পুরে নাকি একটা পুরোহিত একজন মেয়েকে গলা কেটে হত্যা করে, তারা মেয়েটির কোনো পরিচয় জানতে না পেরে হিন্দু ভেবে দাহ করে দেয়। আরেকটা কথা সাহেব, বাবু প্রায় বিড়বিড় করে একটা কথা বলে,

কি কথা?

কেউ নাকি ফিরে আসবে,কে সেটা জানতে চাইলে কিছু বলে না।

মিশ্র বাবুর সাথে দেখা করা যাবে?

চলুন ভেতরে। তবে বেশিক্ষণ থাকতে পারবেন বলে মনে হয় না।

সবাই যখন নারায়ণ মিশ্রের ঘরে গিয়ে পৌছালো তখন না চাইতেও নাকে রুমাল দিতেই হলো। একটা মাংস পঁচার গন্ধে ভরে উঠে সারা ঘর। আর সেই ঘরেরই ঠিক মাঝখানে শুয়ে রয়েছে একটা মানুষ। গায়ে একটা চাদর টানা থাকলেও বুঝতে অসুবিধে হয় না এই শরীরে মাংস বলতে কিছুই নেই, যা ছিলো সবই এখন পোকার দখলে। তবুও চাদরটা একবার সরাতে বললেন ইন্দ্রনীল স্যানাল। আর সরাইতেই বুকটা ধরাস করে উঠলো। এটাকে কী বেঁচে থাকা বলে? শরীরে চামড়া বলতে কিছুই নেই। ঠিক যেনো একটা চামড়া ছিলা মাংস পিন্ড পড়ে আছে বিছানার উপর। আর সেই মাংসের দলার উপর কিলকিল করছে পোকার দল।

নতুন সত্যি ভূতের গল্প

যেনো দেহটা তাদের রাজ্য, তারা ইচ্ছে মত শাসন করছে সেটাকে। তবে মানুষটা এখনো জীবিত। চাদর সরাতেই ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলো মানুষটা। সেটা পোকাদের চলাফেরায় নাকি চাদর সরানোর কারণে সেটা ঠিক বোঝা গেলো না। নিজেদের আর ধরে রাখতে পারলেন না উনারা । নাক মুখ চেপে দৌড়ে বাইরে চলে আসলেন। আর তারপর বমি করে দিলেন। এটাকে কী প্রতিশোধ বলে? যদি তাই হয় তবে এটা মৃত্যুর থেকেও বেশি যন্ত্রণাময়।

সন্ধ্যা নামবে নামবে করছে, দিনের আলো ফুরিয়েছে অনেক আগেই। তিনজন আবারও জিপে চেপে বসলেন। বেশ কিছুক্ষণ কোনো কথা হলো না কারও মাঝেই। এমন নিমর্মতা হয়তো তারা এর আগে দেখেনি কখনো তাই এখন কী ঠিক বলা উচিত সেটা বুঝে উঠতে পারছেন না কেউই। তবে সব কিছুরই একটা শেষ আছে। ইন্দ্রনীল স্যানালই ভাঙলেন সেটা,

এখন কী করবেন ভাবলেন কিছু?

প্রশ্নটা শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন অদম্য পাল। বললেন,

রিপোর্টে এসেছে গোল ধারালো অস্ত্রটা বাইরে থেকে ঢুকানো হয়নি, বরং পেটের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে, আর সেটাও পরপর নয় এক সাথে। এর ব্যাখা কী হতে পারে অলৌকিকতা ছাড়া?

তাহলে?

বন্ধ করে দিবো কেসটা।

কারণ হিসাবে কী বলবেন হেড অফিসকে?

হাতে সময় আছে কিছু একটা ভেবে বের করবো। এত বছরের পুলিশি অভিজ্ঞতা থেকে হয়তো এইটুকু করতে পারবো, কী বলেন?

দুইজন অফিসারের কথার মাঝে হঠাৎ-ই জিপটায় ব্রেক কষলেন শিবনাথ। এমন আচরণের কারণ জানতে চাইলে বললেন,

স্যার একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে সামনে। হয়তো বিপদে পড়েছে।

অন্ধকার ততক্ষণে নেমে গেছে, আর তাই গাড়ি হেট লাইট গিয়ে পড়ছে রাস্তার সামনে। তাকিয়ে দেখলেন কথা সত্যি একটা সতেরো আঠারো বছর বয়সের মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার ঠিক মাঝখানটায়। ভাগ্যিস শিবনাথ নজর রেখেছিলো, নয়তো যেকোনো বিপদ ঘটতে পারতো। গাড়ি থামতেই এগিয়ে আসলো মেয়েটি। বললো,

আমাকে একটু সামনের গ্রামে নামিয়ে দিতে পারবেন? বড্ড বিপদে পড়েছি।

উঠো। কিন্তু এভাবে গাড়ির সামনে আসাটা উচিত হয়নি তোমার, যদি কোনো দূঘর্টনা ঘটতো?

মেয়েটা কিন্তু এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দিলো না। হাসলো কী? হুমমম তেমনটাই তো মনে হলো। অনুমতি পেয়ে গাড়ির পিছনের দিকটায় গিয়ে বসলো মেয়েটি। মেয়েটির গন্তব্যে পৌঁছাতে বেশিক্ষণ লাগলো না। পথটা মন্দিরের পাশ দিয়ে শহরের দিকে চলে গেছে। মেয়েটি হয়তো এই মন্দিরেই নামবে। গাড়ি থামাতেই নেমে পড়লো মেয়েটি। চলেই যাচ্ছিলো, হঠাৎ-ই ইন্দ্রনীল স্যানাল প্রশ্ন করলেন,

এটাকে কী গ্রাম ধরে?

গৌড়পুর।

আর তোমার নাম?

পার্বতী।

নাম শুনে বুকটা ধক করে উঠলো সবার। যদিও তারা জানে একই নামে হাজার মানুষ থাকতে পারে, ঘটনাটার রেশ এখনো কাটেনি কারও তাই হয়তো নামটা শুনেই বুকটা ধক করে উঠলো।

Bengali Bhooter Golpo

তুমি বুঝি এখানেই থাকো?

না, সতপুরে থাকতাম, এখন এখানে থাকি।

সতপুর? মানে তারা এইমাত্র যেখান থেকে আসলো সেটাও তো সতপুর গ্রাম । বুকটা ধকধক করে উঠলো ইন্দ্রনীল স্যানালের। ধরা ধরা গলায় পরের প্রশ্ন টা করতেই যাচ্ছিলো কিন্তু তার আর প্রয়োজন পড়লো না, প্রশ্ন করার আগেই যেনো বুঝে গিয়েছিলো মেয়েটি পরের প্রশ্ন ঠিক কী হতে পারে। তাই ঠোটের কোণে একটা মিহি হাসি এনে বললো,

বাবার নাম হরিনাথ।

কথাগুলো বলে আর একমূহুর্তে দাঁড়ালো না মেয়েটি। ঠিক যেনো উবে গেলো রাতের অন্ধকারে। মুহ্যমানের মত বসে রইলো তিনজন পুলিশ অফিসার। তাকিয়ে রইলো মেয়েটির চলে যাওয়ার দিকে।

গাড়ি চালু করেন শিবনাথ বাবু। ফিরতে হবে, বড্ড দেরি হয়ে গেলো।

আধো আধো গলায় কথাগুলো বললেন অদম্য পাল। গাড়ি চলতে শুরু করলো। একটু পরই শহরের পাকা রাস্তা, তারপর তারা ফিরে ঝলমল করা কলকাতা শহরে। সেখানে কেবল মানুষের হৈচৈ। গাড়ির হর্ণের শব্দ আর ব্যস্ততা। যেখানে রয়েছে কেবল কে কাকে পিছনে রেখে সামনে যাওয়ার প্রতিযোগীতা। সেখানে হয়তো পাবর্তীকে সবাই কেবল গুজব বলে উড়িয়ে দিবে। কিন্তু আসলেই কী তাই?

পুলিশের জিপ গাড়িতে চলছে নিজ গতিতে। কারও মুখে কোনো কথা নেই। কিন্তু হঠাৎ-ই অদম্য পাল খানিকটা বিচলিত হয়েই প্রশ্ন করলেন,

একটা বিষয়ে খটকা কিন্তু থেকেই যায়। দেখুন, চোখের সামনে যা ঘটলো তাতে তো এটাকে ভুল কিংবা বিশ্বাস করার কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না। পারে কী?

অবিশ্বাস করছি না তো। তাছাড়া এমন জলজ্যান্ত প্রমানের পর অবিশ্বাস করার কোনো পথ আছে কী?

তা নেই, তবুও কেমন যেনো একটে খটকা লাগছে। দেখুন আমি শুনেছি যে, কেনো প্রতিশোধ পরায়ণ আত্মা তার প্রতিশোধ নেওয়া শেষ হলে মুক্ত হয়ে যায়। আর দেহ ধারণ করতে পারে না। কিন্তু এখানে তো তেমনটা দেখলাম না। মেয়েটি দিব্যি দেহ নিয়ে চলাফেরা করছে।

কথাটা শুনে খানিকটা অবাক হয়েই ইন্দ্রনীল স্যানাল বললেন,

তবে?

সেটাই তো ভাবছি।

তবে কী তার প্রতিশোধ নেওয়ার পালা শেষ হয়নি?

তাই বা হয় কীভাবে? মেয়েটি যা বলেছিলো তার সবই তো করেছে, তাহলে? যদি না……

কথাটা শেষ হয় না অদম্য পালের, তার আগেই চকিতে বিদ্যুৎ খেলে যায় পুরো শরীরে। আর সেই সাথে শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে আসে একটা শীতল স্রোত।

শিবনাথ বাবু, গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিন। তাড়াতাড়ি করুন, সামনে খুব বড় কিছু একটা ঘটতে চলেছে।

ফ্ল্যাটের দক্ষিন দিকে যে বড় ঘড়িটা সেটে আছে সেখানে দশটা বেজেছে বেশ কিছুক্ষণ আগে। তবে এখনো ঘরের আলো নিভে যায়নি। আর সেই আলোতেই দেখা গেলো ঘরের বেডরুমে পড়ে থাকা একটা নিরথ দেহকে। মৃত নয়, শ্বাস চলছে। কিন্তু তার এমন অবিন্যস্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে থাকার কারণই বা কী? তিনি কী খুব ভয় পেয়ে সংজ্ঞা হারিয়েছেন? হুমমম তিনি সংজ্ঞা হারিয়েছেন। আর তার এমনটার পিছনে কী কারণ থাকতে পারে সেটা বুঝতে খুব একটা অসুবিধে হলো না।

অবনীর নিথর দেহের পাশেই শূন্যে ভাসছে একটা বিভৎস প্রেতমূর্তি। আর প্রেতমূর্তির কালো কুচকুচে হাতের উপর পরম নিন্দ্রায় মগ্ন হয়ে দোলনার মত দোল খাচ্ছে একটা বছর ছয় সাতেকের মেয়ে। সুপতা। প্রেতের দুই হাতের কুচকুচে আঙ্গুলগুলো ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগলো ছোট ছোট সর্পতে। আর সেই প্রাণীগুলো ধীরে ধীরে জড়িয়ে নিতে লাগলো মেয়েটার পুরো শরীর। বাচ্চা মেয়েটি কিন্তু কোনো প্রতিবাদ করলো না। বরং দেখে মনে হলো বেশ ভালো লাগছে তার। হয়তো সে ভেবেছে তার পরম মমতা ময়ী মা তার পুরো শরীরে বুলিয়ে দিচ্ছে স্নেহের পরশ। ঘুম আরও গাঢ় হয়ে আসে মেয়েটির। আর সেটা দেখে বোধহয় প্রেতমূর্তিটি খুশি যে হলো না সেটা বোঝায় যাচ্ছে।

সে তো এমনটা চায়নি, সে চেয়েছে বাচ্চাটি ভয় পাক, চিৎকার দিয়ে উঠুক। কিন্তু সেটা কখন হলো না তখন ধীরে ধীরে বিশ্রি হাসি মাখানো মুখটা ক্রমেই বদলে যেতে লাগলো বিরক্তিতে। আর পরক্ষণেই মনিহীন চোখের কোটর থেকে বেরিয়ে আসলো দুইটা সাপ। দুলতে থাকলো মেয়েটির চারপাশে, ঠান্ডা হিম শীতল পরশ বুলিয়ে দিতে লাগলো পুরো শরীরে। কিন্তু না তাতেও যখন মেয়েটির ঘুম ভাঙলো না, তখন আর সহ্য করতে পারলো না প্রেতমূর্তি। বন্ধ মুখ হা হতে শুরু করলো ধীরে ধীরে, আর হা হতেই বেরিয়ে আসলো আরেকটা সাপ, যেটাকে জ্বিহ্বা বলে ভুল হয়। হয়তো এখনই মেয়েটির পরম শান্তির ঘুম ভাঙতে চলেছে বিষাক্ত ছোবলে।

কিন্তু না, হলো না তেমনটা। কারণ তার আগেই একটা বুলেট শরীরের এপার ওপার দিয়ে বেরিয়ে গেলো। যদিও তাতে ক্ষতের সৃষ্টি হলো না। কিন্তু প্রেত এই মাত্র যে উদ্দেশ্যে তার সাপের মত জ্বিহ্বাটা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো সেটা ব্যর্থ হয়েছে। এমন অপ্রত্যাশিত ভাবে কারও উপস্থিতি মোটেও আশা করেনি সে। আর তাই চমকে উঠে চকিতে বিদ্যুৎ গতিতে পিছন ফিরে তাকালো প্রেতমূর্তি। গুলিটা ছুঁড়েছে শিবনাথ মিশ্র। তার বন্দুক এখনো তাক করা শূন্যের ভাসতে থাকা প্রেতের দিকে। অদম্য পাল বললেন,

পার্বতী, শোনো, ছেড়ে দাও বাচ্চাকে। ওর কোনো দোষ নেই। বিশ্বাস করো তার কোনোই দোষ নেই।

কথাটা শুনে খোলা চুলের মত মাথার উপরের ছোট বড় মাঝারি গড়নের সাপগুলো কিলবিল করে উঠলো। ধীরে ধীরে বাচ্চা মেয়েটিকে বিছানার উপর রাখলো।

দেখো, আমি মানছি তোমার পরিবার আর তোমার সাথে যা হয়েছে অন্যায় হয়েছে। কিন্তু তার শাস্তি এই বাচ্চাকে কেনো দিবে বলো?

অদম্য পালের এই কথায় ফুসতে থাকে প্রেতমূর্তি। ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে তার গতিবিধি। চোখ আর মুখ থেকে বেরিয়ে আসা সাপগুলো নিজেদের স্থানে ফিরে যায়। এখন তাদের সামনে যে দাঁড়িয়ে আসে সে কোনো ভয়ংকর প্রেত নয় বরং একটা সতোরো আঠারো বছর বয়সী অতীব রুপসী যুবতী।

Bhuter Golpo 2022

হরিনাথে দুই বাচ্চা ছেলেও দোষ ছিলো না তো, ছিলো না তার স্ত্রীরও আর আমার? আমার কী দোষ ছিলো? যেখানে বাবা চুরিই করেনি সেটা জানার পরও ন্যায় বিচার পাইনি তো। তখন তো কেউ বলেনি এটা অন্যায়? তাহলে আজ কেনো?

দেখো, তুমি যা চেয়েছো সেটা হয়েছে, নারায়ণ মিশ্রের দুই ছেলে এখন নেই, উনারও যে অবস্থা তাতে আর কোনো ভরসাই নেই বলতে গেলে। এই মেয়েটা তার বংশকে রক্ষা করতে পারবে না। বোঝার চেষ্টা করো, সুনিন্দ্র বিয়ের পর সেখানে একবারের জন্যও যায়নি। তার মেয়েটাও যায়নি, সে জানেই না যে তারই পরিবার এমন একটা কাজ করেছে।

কিন্তু এই মেয়েটার শরীরেও সেই রক্তই বইছে।

হ্যাঁ বইছে, কিন্তু এটাই কী তার অপরাধ? না এটা আমি মানছি না। যে বৃদ্ধ পুরোহিত নিজের জীবন বিপন্ন করে তোমাকে এই শক্তি লাভ করে দিয়েছে তিনি যদি এমনটা দেখতেন তাহলে নিশ্চয় তিনি খুশি হতেন না। হতেন কী? দেখো, সেই ঘটনার সাথে যারাই জড়িত ছিলো তারা আজ কেউ বেঁচে নেই। নারায়ণ মিশ্রও মৃত্যুর থেকে বেশি যন্ত্রণা ভোগ করছে। দয়া করে শোনো আমার কথা। মেরো না বাচ্চাকে।

অদম্য পালের কথাগুলো শুনে কী যেনো একটা ভাবলো পার্বতী।

বেশ, তবে এর মূল্য কিন্তু দিতে হবে।

মূল্য কিসের মূল্য?

পার্বতী কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর দিলো না। ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেলো শূণ্যে।

কী হলো বলে যাও, কিসের মূল্য চাও তুমি? পার্বতী। শোনো পার্বতী।

আর কোনো উত্তর আসে না। কেবল একটা মিহি হাসির স্বর ভেসে আসলো অনেক দূর থেকে। আর একটু পর সেটাও মিলিয়ে গেলো।

এর পর বেশ কিছুদিন কেটে গেছে। পার্বতী আর দেখা দেয়নি কাউকেই। কিসের মূল্য সে চায় সেটাও জানা যায়নি, কারণ বাচ্চাটা খুব ভালো আছে। তবে সুনিন্দের স্ত্রীর কথা আলাদা। পুরুষের তুলনায় স্বামীর শোক কাটতে একটু বেশিই সময় নেয় মেয়েরা। কথাটা যদিও তিক্ত তবে মিথ্যে নয়।

গভীর রাত, টেলিফোনের বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো অদম্য পালের। মাঝরাতে এমন ঘুম ভাঙলে বেশ বিরক্তই লাগে। অদম্য পালের মুখেও একটা বিরক্তি ভাব ফুটে উঠলো।

হ্যালো।

হ্যালো, স্যার আমি ইন্দ্রনীল স্যানাল বলছি, কলকাতা পুলিশ।

পরিচয় পেয়ে খানিকটা দমে গেলেন অদম্য পাল। বললেন,

হ্যাঁ বলুন , কিন্তু এত রাতে? কোনো অঘটন ঘটেনি তো?

ঘটেছে। শিবনাথ বাবু মারা গেছেন।

কিহ্? মারা গেছেন? কীভাবে?

হার্টফেল। ডাক্তার বলেছে, কিছু একটা দেখে খুব ভয় পেয়েই এমনটা হয়েছে।

আর কিছু?

নাহ্।

টেলিফোনের লাইনটা কেটে যায় ওপাশ থেকে। বুকটা কেমন যেনো একটা মোচড় দিয়ে উঠে অদম্য পালের। কানে বেজে উঠে,

“মুল্য কিন্তু দিতে হবে।”

মূল্য দিতে হলো, কিন্তু কেনো? বাধা দেওয়াতে? নাকি তার দিকে তাক করে গুলি চালানোর জন্য?

পুরো ঘরটা ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে আসে, বড্ড শীত করছে তার। আর সেই সাথে একটা মিহি হাসি ভেসে আসছে অনেক দূর থেকে। আর পরক্ষণেই কেউ একজন কানের কাছে ফিসফিস করে বলে উঠলো,

মূল্য দিতে হবে।

আর তারপরই মিহি কণ্ঠস্বরটা বদলে গেলো খিলখিল হাসিতে, আর পরোক্ষণেই পৈশাচিক অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো পুরো ঘর। আর একটাই কথা, “মূল্য দিতে হবে”।

[সমাপ্ত]

আরো পড়ুন – মৃত্যুর পরের চিঠি

Leave a Reply

Your email address will not be published.

close