Bhalobasar Golpo 2022 ‘ভালোবাসার স্মৃতি’

ভালোবাসার গল্প ২০২২, ভালোবাসা নিয়ে বাংলা গল্প [Bhalobasar Golpo, Love Story In Bengali 2022] (Valobasar Golpo 2022, Bhalobasa Koster Golpo)

Bhalobasar Golpo
গল্পভালোবাসার স্মৃতি
লেখকরিধিমা জান্নাত রূপা

নিহানের সাথে আমার বিয়ে হয়েছিলো পারিবারিক ভাবেই। ওর পরিবারের সাথে যখন প্রথম আমাকে দেখতে আসে ভয়ে আর লজ্জায় মরে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিলো আমার। ওর পরিবারের একমাএ সদস্য ছিলো ওর মা। সেদিন ওর দূরসম্পর্কের বোন আর তার জামাই এসেছিলেন সাথে। নিহানের মা আমাকে নিজের কাছে বসিয়ে হাত দুটো জড়িয়ে ধরে ছিলেন, তখন ওনাকে পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর মহিলা মনে হচ্ছিলো আমার। তিনি হয়তো বুঝতে পেয়েছিলেন আমার কাঁপা কাঁপা অবস্থা দেখে। আমার হাত দুটো শক্ত করে ধরে বলেছিলেন,

“আমি কিন্তু অনেক খারাপ শ্বাশুড়ি হবো বলে দিলাম।”

ওনার কথা শুনে সবাই অবাক চোখে তাকিয়ে ছিলেন ওনার দিকে। আর উনি হেঁসে বলেছিলেন,

“সত্ত্যিই অনেক খারাপ শ্বাশুড়ি হবো বলে দিলাম কিন্তু, যদি আমাকে এতটা ভয় পাওয়া হয়।”

কথাটা বলে হালকা করে জড়িয়ে ধরলেন আমায়, আবারো বলে উঠলেন,

“কতদিনের ইচ্ছে আমার ছোটো একটা মেয়ে থাকবে, কতজনকে দেখতাম মেয়ে নিয়ে ঘুড়তে। খুব ইচ্ছা হতো, ইস্ আমারও একটা মেয়ে থাকলে। একসাথে ঘুরতাম শপিং করতাম। এখন থেকে তো তুই আমার মেয়ে, মাকে কি কেউ ভয় পায়?”

আমি তখন সত্যিই ভাবতে পারি নি তিনি এমন কোন কথা বলবেন। আম্মুর দিকে তাকিয়ে উনি বললেন,

“কি আপা, দিবেন না আপনার মেয়েকে আমার মেয়ে হতে?”

আম্মুর চোখে তখন একরাশ নোনা জল এসে ভীড় করেছিলো। হয়তো সেটা ছিলো খুশিতে। তার মেয়ে যে আরেকটা মা পাবে সেটা হয়তো আম্মু বুঝতেই পারছিলো না।

নিহানের সাথে আমাকে যখন আলাদা ভাবে কথা বলার জন্য পাঠানো হয়েছিলো, আমার কাঁপা-কাঁপি আর দেখে কে? হয়তো কখনো কোনো ছেলের সঙ্গে কথা বলা হয়নি তাই। ঠিক ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতেও পারছিলাম না, মনে হচ্ছিলো এখনই হয়তো কাঁপতে কাঁপতে পরে যাবো আমি। সেই মুহুর্তে নিহান আমর দাত দুটো খুব শক্ত করে ধরে বিছানায় বসিয়ে নিজেও আমার পাশে বসে পরে। তখন এক অন্য জগতে চলে গেছিলাম, এভাবে প্রথম দেখায় হাত দুটো জড়িয়ে ধরবে আমি কল্পনাও করতে পারছিলাম না। কিন্তু তখন এক মুহুর্তের জন্য মনে হচ্ছিলো ভরসার হাত দুটো হয়তো পেয়ে গেছি। কিন্তু আমার কাঁপা-কাঁপি টা এক মুহুর্তের জন্যও থেমে থাকে নি বরং আরও বেড়ে গিয়েছিল। নিহান আমার হাত দুটো আরও শক্ত করে ধরে বলেছিলোন,

এমন ভাবে কাঁপা-কাঁপি শুরু করেছো যেন মেয়ে দেখতে নয়, কিটনাপ করতে আসছি?”

আমি তখন নিচে থেকে আমার দৃষ্টি উঠিয়ে ওর দিকে প্রথম তাকিয়ে ছিলাম। তখন শুধু একটা কথায় মাথায় এসেছিলো,”মাসাআল্লাহ”।

কিছুক্ষণের জন্য হয়তো হাড়িয়েও গেছিলাম। একটা মানুষ এতটা নিখুঁত কিভাবে হয়? নাকি আল্লাহ তাকে নিজ হতে বানিয়েছেন। উনি কি আসলেই এতটা সুন্দর নাকি শুধু আমার চোখেই এমন লাগছে? আমাকে এমন করে তাকিয়ে থাকতে দেখে সে হেঁসেছিলো অনেক। ছেলে মানুষের হাঁসিও যে এত সুন্দর হয়? তা কখনোই ভাবতে পারি নি আমি। নিহান বাঁকা হেসে বলেছিলো,

“কি ম্যাডাম কাঁপা-কাঁপি কমছে? এই কয়েক দিনে যা কাঁপা-কাঁপি করার একেবারে করে নিয়ো, বাসর রাতে কিন্তু এগুলো একদমি চলবে না।”

ওর কথা শুনে আমি চমকে উঠি, কি বলেন এগুলো উনি? প্রথম দেখাতেই কেউ কাউকে এসব কথা বলতে পারে কি? আমার কাঁপা-কাঁপিটা ধীরে ধীরে আরও বেড়ে যাচ্ছিলো। নিহান আবারো তার মন ভুলানে হাঁসি হেঁসে বলেছিলো,

“আমার কিন্তু একেবারে দুটো বাচ্চা লাগবে। একটা হবে তোমার মতো মিষ্টি, আর একটা হবে আমার মতো রাগী। আমি কিন্তু অনেক রাগী মানুষ, সামলাতে পারবে তো আমায়?”

ওর কথাগুলো শোনার পর আমি কিছুতেই ওখানে বসে থাকতে পারছিলাম না। অনেক কষ্টে আমার হাত দুটো ছাড়িয়ে সেখান থেকে চলে গেছিলাম বাড়ান্দায়। নিহানও তখন আমার পিছনে এসে এসেছিলেন। হালকা করে হেঁসে বলেছিলেন,

“উত্তররা না দিলেও, সেই তোমাকেই কিন্তু আমাকে সামলাতে হবে। আর লজ্জাটাও পারলে কমিয়ে নিও।”

শেষের কথাটা অনেক কাছে এসেই বলেছিলেন, তারপর বিদায় নিয়ে চলে গিয়েছিলো সেদিনের মতো।

আস্তে আস্তে চলে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত আমাদের বিয়ের দিন। এর মাঝে নিয়ম করে আমায় ফোন দিতো সে। প্রতিদিন ফোনে কথা বলা, মাঝে মাঝে আমাকে নিয়ে ঘুড়তে যাওয়া, আর তার ছোটো ছোটো আবদার গুলো আমাকে নিয়ে পূরণ করা, এগুলোই যেন ছিলো ওর একমাত্র কাজ। কেন যেন ওর কোন কাজে না করতে পারিনি আমি। ওই কয়েক দিনে নতুন ভাবে চিনেছিলাম ওকে, জেনেছিলাম নতুন ভাবে। নিহানের সাথে আমার সম্পর্কটাও অনেক এগিয়ে গিয়েছিল, সেখানে নিহানের অবদানটাই ছিলো অনেক বেশি।

বিয়ের পর প্রথম শ্বশুর বাড়িতে পা রাখার সময় অন্য রকম এক অনুভূতি হচ্ছিলো আমার সাথে বুকের ডান পাশে টিপটিপ শব্দটা, আর হালকা কাঁপুনি ফ্রি। মনে মনে বলেছিলাম, ‘এটাই আমার সংসার।’

সকল রীতি অনুষ্ঠান শেষ করে নিহানের আপু যখন ওর রুমে নিয়ে যাচ্ছিলো তখন অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছিলো আমার। বুঁকের বা পাশের টিপ-টিপ শব্দটা যেন অতি মাএায় বাড়ছিলো। সেই সাথে আমার হাত-পা আরও জোরে কাঁপতে শুরু করে।

নিহান রুমে এসে আমার ঘোমটা তুলে হাতদুটো ধরে যখন বলেছিলো,

“আমার বউটার কি কাঁপা-কাঁপিটা কমছে? নাকি আমায় দেখার পর আবার শুরু হবে? এই বার বাসরটা কি করা যাবে?”

কথাটা শোনার পর লজ্জায় খাটের সাথে মিশে যাচ্ছিলাম আমি। কোন কথায় যেন আমার মুখ দিয়ে বের হচ্ছিল না।

“উফ্ বউ এভাবে লজ্জা পাও কেন বলো তো? মনে হচ্ছে একদম খুন হয়ে যাবো আমি। একদম এখানে এসে লাগছে কিন্তু।”

আমার অবস্থা বুঝতে পেরে নিহান শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিলো আমায়। আমিও লেপ্টে ছিলাম ওর বুকের সাথে, সবচেয়ে শান্তির জায়গা বলে মনে হচ্ছিলো নিহানের বুকে।

তারপর শুরু হয় আমাদের ভালোবাসার এক নতুন অধ্যায়। প্রতিদিন নতুন ভাবে চিনতে পারি নিহানকে, নতুন করে প্রতিদিন প্রেমেও পরি তার। নিহান যেন ওকে ভালোবাসতে বাধ্য করেছিলো আমায়। একটা মানুষ এতটা পারফেক্ট কিভাবে হয়? নিহানকে না দেখলে হয়তো বুঝতেই পারতাম না। বিয়ের আগে ছিলো প্রেমিক আর একজন মায়ের দায়িত্ববান ছেলে, কিন্তু বিয়ের পর সে সবকিছুই হয়ে উঠেছিল।

নিহানের পরিবার নিহানের মাকে নিয়েই ছিলো, বিয়ের পর আমিও যুক্ত হলাম তাদের পরিবারের একজন হয়ে। ভালোবাসা, হাসি মজা নিয়ে দেখতে দেখতে চলে গেল কয়েক মাস। এই কয়েক মাসে যেন অন্য আমিতে পরিণত হয়েছিলাম। নিহানের মা আমায় সারাদিন মাথায় তুলে রাখত। মুখ ফুটে কিছু বলার আগেই নিহান আর মা আমার সামনে হাজির করতো। মাঝে মাঝে মনে হতো উনি নিহানের নয় আমার মা। এটা নিয়ে নিহানের অনেক আফসোস হতো। আর সারাক্ষণ বলতো মা ওকে আর ভালোবাসে না, আমিই নাকি ওনার মেয়ে, নিহানকে সবাই ভুলেই গেছে। এটা নিয়ে নিহানের সাথে বেশ ঝগড়াও করতাম।

আজ নিহানের ছুটি থাকায় দুপুরে একসাথে খেতে বসেছি সবাই মিলে। খাওয়ার সময় হঠাৎ করেই গাঁ গুলিয়ে আসলো আমার। কিছুদিন ধরেই কেন জানি না এমন হচ্ছে, থেকে থপকে মাথা ব্যাথা আর ঠিক মতো খেতেও পারি না তেমন। হঠাৎ চারিদিকে কেমন যেন ঘুরে উঠলো, চোখের সামনে অন্ধকার হয়ে আসলো। সমস্ত সয্যের সীমা পেরিয়ে যতটুকু খেয়েছিলাম বাথরুমে গিয়ে সব বের করে দিলাম। মা শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে নিহান দৌড়ে গিয়ে আঁকড়ে ধরে বলে উঠলো,

“দিবা কি হয়েছে তেমার? হঠাৎ করে এমন হলো কেন? কি হয়েছে তোমার? এই দিবা, দিবা?”

আমি কেন জানি জবাব দিতে পারলাম না, শুধু আঁকড়ে ধরে আছি ওকে। বেশ কিছুদিন ধরেই কিছু খেতে পারছিলাম না তার সাথে মাখা ঘোরা। নিহান আর মাকে কিছুই বলিনি তারা অযথা চিন্তা করবে তাই কিন্তু আজ এমন হবে ভাবতেই পারি নি আমি। মা তো শুধু বকেই যাচ্ছে আমাকে,

“আজকালের ছেলেমেয়েদের নিয়ে পারিনা আর, সারাদিন কেমনে যে না খেয়ে থাকে আল্লাই জানে? না খেয়ে থাকে তো থাকেই আবার সারাদিন না খেয়ে কাজও করতে হবে তার। কেন? আমি কি থাকি না বাড়িতে?”

মায়ের কথা শুনে নিহানের দিকে তাকালাম। নিহান চোখ রাঙিয়ে বলে উঠলো,

“মা যা বলছে তা কি সত্যি দিবা? কতদিন বলছি একটা কাজের লোক রাখি, আমার কথা তো কানেই তুলে না কেউ।”

মা রেগে বলে উঠলো,

কেনো? আমাকে কি কারের চোখে পড়ে না? আমি কি এতটাই অচল হয়ে গেছি? আর কাজ করবি ভালো কথা খাওয়া-দাওয়া তো ঠিক করে করবি।”

ওফ মা আর বকো না তো”

আস্তে করে বলে উঠলাম আমি। মা সাথে সাথে বলে উঠলো,

দেখ নিহান দেখ, বলে কি? সারাদিন না খেয়ে থাকবে আর তাকে বকাও যাবে না?”

আমার একদমই ভালো লাগছিলো না। মনে হচ্ছে এখনি পড়ে যাবো, এই মুহুর্তে শুইয়ে পড়লে অনেক ভালো লাগতো। নিহানকে আস্তে করে বললাম,

রুমে যাবো।”

নিহান ওকে নিয়ে রুমে যা, এমনিতেই মেয়েটার শরীরটা ভালো নেই। একটু আরাম করুক, আমি খাবার নিয়ে আসছি।”

খাবারের কথা শুনে আবারো গাঁ গুলিয়ে আসলো। নিহানকে আবারো বললাম রুমে যাওয়ার কথা। নিহান রুমে নিয়ে গিয়ে আমাকে ইচ্ছা মতো বকলো। এর মাঝে মা রুমে ঢুকে এক প্লেট খারার নিয়ে নিহানের হাতে ধরিয়ে দিয়ে চলে গেল, নিহান প্লেটটা সাবার করে আমাকে খাইয়েও দিলো। তারপর বলে উঠলো,

এখন একটু ঘুমাও বিকেলে ডাক্তার দেখিয়ে নিয়ে আসবো।”

আমি কিছু বলার আগেই চুপ করিয়ে দিলো আমাকে।

তার কথা মতো সন্ধ্যার সময় যেতে হলো ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার কিছু টেস্ট করতে বললেন, সাথে কিছু মেডিসিনও দিলেন আর বললেন কাল সকালে রিপোর্টটা দিলে তাকে যেন দেখিয়ে নেয়। নিহান হ্যাঁ বলে আমাকে নিয়ে বেড়িয়ে আসলো।

গত দুইদিন নিহানের আফিসের কাজে ব্যাস্ত থাাকায় রিপোর্ট আনতে পারে নি সে। ওষুধ খেয়ে অনেকটাই সুস্থ আছি বলা চলে। তিন দিন পরে আজ রিপোর্টটা আনার কথা নিহানের, সকালে যাওয়ার সময় বলে গেছে রিপোর্টটা নিয়ে ডাক্তারকে দেখিয়ে নিয়ে আসবে। মনের মধ্যে একটা ভয় কাজ করছিলো তখন, না জানি রিপোর্টে কি আসে? নিহানকে অনেকক্ষণ জড়িয়ে ধরে ছিলাম। মনের মধ্যে একটা অজানা ভয় এসে ভীর করেছিলো।

বিকেলের বাড়ান্দায় বসে বসে সকালের কথাগুলো ভাবছিলাম। সকালে একটা ভয় কাজ করলেও এখন ভালোলাগা আর লজ্জা দুটোই কাজ করছে আমার। কিছুক্ষণ আগেই নিহানের সাথে ফোনে কথা হয়েছে, কিন্তু কিছুতেই কথাটা বলতে পারি নি।

আমার শুধু মনে হচ্ছে ও যখন রিপোর্টটা দেখবে তখন কেমন রিয়েক্ট করবে? কিছুটা আন্দাজও করে নিয়েছি। কারণ আমি তো জানি রিপোর্টে কি আছে।

গত দুইদিনে কিছুটা সুস্থ থাকলেও আজ সকালে নিহান অফিসে যাবার পর মা এক গ্লাস দুধ নিয়ে আসে খাবার জন্য। ইচ্ছে না থাকা সত্তেও খেতে হয়েছিল, তার পরেই গাঁ গুলিয়ে গড়গড় করে বমি হয়। ঠিকঠাক খাওয়ার পরেও এমন দেখে মা অনেকটা অবাক হয়েছিলেন। বেশ কিছুক্ষণ চিন্তা করার পর বাইরে থেকে একটা প্রেগন্যান্সির কিট নিয়ে এসে ধরিয়ে দিয়েছিলোন আমার হাতে। প্রেগন্যান্সি টেস্ট করার পর তার রেজাল্ট পজিটিভ আসে। খুশিতে মাকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কান্না করেছিলাম তখন।

রাত ১০ঃ৫৯ বাজে এখনো নিহান আসে নি, মা দুইবার এসে বলে গেছে আমাকে এই শরীর নিয়ে না জেগে থাকতে, তবুও আমি ওর জন্য অপেক্ষা করে আছি ওর জন্য। ওর বাবা হওয়ার খুশিতে কেমন করে দেখার জন্য। বারবার ফোন দিয়েও পাচ্ছিলাম না ফোন বন্ধ বলছে, হয়তো ফোনে চার্জ নেই। মাঝে মাঝেই এমন দেড়িতে আসে নিহান। দেড়ি করলে তো ফোনে জানিয়ে দেয় কিন্তু আজ জানালো না কেন? পরের মুহুর্তেই মনে পড়লো ফোন তো বন্ধ বলছে, তাহলে ফোনে চার্জই নাই।

গাড়ির শব্দ আর কারোর চিৎকার চেচামেচির জন্য হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল। কখন যে চোখ দূটো বন্ধ হয়ে গেছিলো বুঝতেই পারি নি। পাশ থেকে ফোনটা নিয়ে অন করতেই নিহানের হাসিমাখা মুখটা ভেসে উঠলো। প্রথম দেখায় ওর হাসিতেই আমি ঘায়েল হয়েছিলাম, আর এখনো ওর সেই হাসিটা আমার রাগকে দূরে ঠেলে দেয়। ১২ঃ৩৬ বাজে, এখনো কি নিহান আসে নি? এত রাতে চিৎকার করছেই বা কে? আর এত গাড়ির শব্দই বা কেন? হঠাৎ মায়ের চিৎকার করে কান্নার আওয়াজ পেয়ে চমকে উঠলাম আমি, দৌড়ে রুম থেকে বেড়িয়ে গেলাম। মাকে

“কি হয়েছে মা? এত রাতে এত মানুষই বা কেন?”

বলে সামনে তাকাতেই আমার পা’দুটো সেখানেই থমকে গেল। আমাকে দেখে সবাই চুপ করে গেল। আস্তে আস্তে এগিয়ে গেলাম সাদা কাপড়ে মোড়ানো নিহানের কাছে। নিহানের শুধু মুখটা বেড়িয়ে আছে। ওর গালে হাত রেখে বলে উঠলাম,

“কি হয়েছে নিহান? এমন করে শুয়ে আছো কেন?”

আমার কথা শুনে মায়ের কান্নার আওয়াজ বেড়ে গেল, সাথে নিহানের বন্ধুদেরও।

“ভাবী, নিহান আর নেই।”

নিহানের এক বন্ধু বলেই কেঁদে উঠলো। আমার হাত সাথে সাথে চলে গেল আমার পেটে। সেদিন আমার চোখ দিয়ে একফোঁটাও পানি বের হয়নি আমার, নিহানের রক্তাক্ত মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবছিলাম নিহান কি বাবা হওয়ার আনন্দটা পেয়েছিলো? ও কি জানতে পেরেছিলো ওর বাবা হওয়ার কথা? এই উত্তর দেবার মতো অবস্থায় নিহান আর ছিলো না। হাড়িয়ে গেছে আমাদের অনাগত সন্তানকে এতিম করে।

তার উত্তর কিছু দিন পর পেয়েছিলাম, নিহানের এক বন্ধু যখন ওর ব্যাগ দিতে আসে। হ্যাঁ ও জানতে পেরেছিলো ওর বাবা হওয়ার কথাটা। সেদিন ডাক্তারের কাছে থেকে রিপোর্ট নিয়ে ফেরার পথেই তার এক্সিডেন্টটা হয় নিহানে। উল্টো দিক থেকে গাড়িটা এসে এমন ভাবে নিহানের গাড়ির সাথে ধাক্কা লাগে যে মাথায় গিয়ে আঘাত লাগে, হসপিটালে নিয়ে গিয়েও শেষ রক্ষা হয় না। নিহানের বন্ধুই বলেছিলো আমায় কথাগুলো। সেদিন মাকে জড়িয়ে অনেক কেঁদেছিলাম, নিহান তাহলে বাবা হওয়ার কথাটা জানতে পেরেছিলো। সেদিনের পর প্রতিটা রাত-দিন অন্ধকারে ছেয়ে থাকতো আমার কাছে।

সময় পেরিয়ে যায় অনেক। ছেলের শোক কাটাতে না পেরে মাও পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে ৬মাস পরেই। একদম একা হয়ে গেছিলাম, কিন্তু কিছুদিন পরে আমার কোলে নতুন ভাবে মায়ের আগমন ঘটে।

বছর ছয়েক পর আমার বাবা, তারপর মাও চলে যায় আমাদের একা রেখে।

আমার আর নিহানের মেয়ে নুহার কোল আলো করে আসে এক ছোট্ট নিহান, দেখতে একদম আমার নিহানের মতে। নতুন ভাবে তারা আবারো আসবে জন্যই কি আমাকে একা রেখে চলে গেছে ওরা??

আজ আমার আর নিহানের বিবাহবাষির্কি। ওর ছবি নিয়ে দেখছিলাম সেই দিন গুলোর কথা মনে করছিলাম, হঠাৎ নিহানকে দেখে আমি চমকে উঠি। হাত-পা প্রচন্ড রকমের কাঁপছে আমার, আমার অবস্থা দেখে নিহান আগের মতো করেই বলে উঠলো,,

আবারও তোমার এই বিখ্যাত কাঁপা-কাঁপি শুরু করে দিয়েছো? আমাকে দেখে তোমার কাঁপা-কাঁপিটা হয়তো আর কমবে না দিবা।”

হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল আমার। প্রচন্ড ঘামছি, মনে মনে ভাবতে থাকলাম এতদিন পরে নিহানকে কেন দেখলাম? নিহান মারা যাবার পর তো কখনো স্বপ্নে ওকে দেখিনি, আজ হঠাৎ কেন দেখলাম তাকে? তাহলে কি নিহানের কাছে যাবার সময় হয়েছে? আমার হাত- পা আবার কাঁপতে শুরু করলো।

আজ কিছুতেই লিখতে পারছি না আমি। প্রচন্ড রকমের কাঁপা-কাঁপির ফলে হাতের লেখাগুলোও এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে যেন। হাত-পায়ের কাঁপা-কাঁপি থামার কোন নামই নিচ্ছে না। ফোঁটা ফোঁটা পানি চোখের কোণ থেকে বেড়িয়ে আসছে। হয়তো সেটা নিহানের কাছে যাবার খুঁশিতে।

[সমাপ্ত]

এরকম আরো গল্প পরতে এখানে টাচ করুন – বাংলা গল্প

Leave a Reply

Your email address will not be published.

close