সমাজ গঠনে ছাত্র-ছাত্রীদের ভূমিকা

ভূমিকা: দেশের আশা-ভরসার স্থল তুরুণ ছাত্রসমাজ।শ্রী, হ্রী এবং ধী এই ত্রিশক্তির সমন্বয়ে দেশের ছাত্রসমাজ পুষ্ট, তাদের বাদ দিয়ে দেশের সমৃদ্ধির কথা চিন্তাও করা যায় না।দু:খসাগর মাঝে আনন্দের লহরি নিয়ে চলে এদের তরী।সংসার কাননে এরাই সৌরভময় পুষ্প। সংসার প্রাঙ্গণের সংস্কারূপ বেড়াজালকে এরাই অপসারিত করে।এরাই ভবিষ্যতের স্বপ্নসাধক। ‘জীবন-মৃত‍্যু পায়ের ভৃত‍্য, চিত্ত ভাবনাহীন’- ছাত্রসমাজ এই সংগীতের প্রকৃত উত্তরাধিকার।

সমাজের সঙ্গে ছাত্রদের সম্পর্ক: ছাত্রসমাজের স্বতন্ত্র চিন্তাভাবনা তাদের চারিত্রিক-বৈশিষ্ট্রকে পৃথক মাত্রা দিয়েছে।একদিকে যেমন জ্ঞান আহরণের তীব্র আকুতি,অন‍্যদিকে পরের কারণে স্বার্থ বলি দিতে ছাত্রসমাজ আগুয়ান। সংসারের ডাক পেলে যেকোনো প্রতিবন্ধকতাকে কাটিয়ে এগিয়ে চলতে তারা কঠোর।যেখানে অন‍্যায়,যেখানে অবিচার, সেখানেই সোচ্চারিত হয়েছে ছাত্রদের সম্মিলিত কন্ঠস্বর। দেশের সংকটে, ঘোরতর দুর্দিনে সাম‍্য, মৈত্রী ও ভাতৃত্বের বাণী পৌঁছে দেয় ছাত্ররাই।সুতরাং, সমাজের মেরুদণ্ড ছাত্ররা- একথা আমরা নিদ্ধিধায় স্বীকার করে নিতে পারি।

নিরক্ষরতা দূরীকরণে ছাত্রসমাজ: নিরক্ষরতা এক বড় সামাজিক সমস‍্যা। সমাজের সার্বিক অগ্রগতি নির্ভর করে সমাজের সব মানুষের স্বাক্ষরতার ওপর। সুতরাং, নিরক্ষরতা দূর করে একসঙ্গে অনেক সামাজিক সমস‍্যার মূলে আঘাত করা যায়। এব‍্যাপারে ছাত্রসমাজের দায়িত্ব ও কর্তব‍্য অপরিসীম। ছাত্রছাত্রীরা শুধু স্কুল কলেজের সীমানার মধ‍্যে থেকে আপন- আপন উন্নতির পথ তৈরি করবে না, তাদের শিক্ষায়তনের সীমা ছাড়িয়ে চলে যেতে হবে পাড়ায় – পাড়ায়, বস্তিতে-বস্তিতে, নিরক্ষর মানুষের ঘরে ঘরে, কবি সুকান্ত লিখেছিলেন,’এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে।’ স্বাক্ষরতা অভিযানে ঠিক এই বয়সের ছাত্রছাত্রীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

কুসংস্কার দূরীকরণে ছাত্রসমাজ: নিরক্ষরতা মতো কুসংস্কার এক সামাজিক ব‍্যধি। সমাজের এক বিরাট অংশের বুকে অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে আছে। কুসংস্কার দূর করা অল্প সময়ের কাজ নয়। প্রকৃতি জগত, নিজের শরীর ও সমাজ সম্পর্কে বিজ্ঞানসম্মত প্রকৃতসত‍্য জানার মধ‍্য দিয়ে কুসংস্কার দূর করা সম্ভব। এই কাজে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে ছাত্রসমাজ। তাদের উচিত কুসংস্কার-বিরোধী জনমত তৈরি করতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা, বিভিন্ন মাধ‍্যমের সাহায্য গ্রহণ কর সংস্কারবদ্ধ মানুষের কাছে প্রকৃত সত‍্য তুলে ধরা।

সাম্প্রদায়িকতা দূরীকরণে ছাত্রসমাজ: সাম্প্রদায়িকতা সমাজের অন‍্যতম শত্রু যা কাঠে ঘুণ ধরার মতো সমাজের কাঠামোয় ঘুণ ধরিয়ে দেয়। সামাজিক ঐক্যকে দুর্বল করে তোলে,সৃষ্টি করে সামাজিক বিশৃঙ্খলা। সাম্প্রদায়িকতার বিরূদ্ধে ছাত্রগণ ব‍্যাপক প্রচার চালিয়ে এই সাম্প্রদায়িকতার বিদ্বেষ-বিষ নাশ করতে পারে। এরজন‍্য সকল সম্প্রদায়ের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সংগঠন গড়ে তোলা প্রয়োজন। ‘জগৎ জুড়িয়া একটি জাতি, সে জাতির নাম মানুষ জাতি।’ এই উপলব্দি জনসমাজে ব‍্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে পারে ছাত্রসমাজ।

প্রতিবন্ধীদের প্রতি ছাত্রছাত্রীদের কর্তব্য: সমাজে দুর্বলতর শ্রেণি প্রতিবন্ধীরা। দুর্ভাগ্যের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে এদের টিকে থাকতে হয়। এরা সবাই সুস্থ সবল মানুষের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। আরও পাঁচটা মানুষের মতো বেঁচে থাকার আশা মনেতে পোষণ করে। সমাজের সজীব, সতেজ ও বলিষ্ঠতম অংশ হিসেবে ছাত্রসমাজের কর্তব্য হল অধিক নিষ্ঠা ও সহমর্মিতা নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ানো। বিভিন্ন মাধ‍্যমকে কাজে লাগিয়ে স্বাস্থ‍্য সম্পর্কিত বিভিন্ন সচেতনতা গড়ে তোলা তাদের একটি অন‍্যতম কর্তব‍্য। শুধু তারাই নয়, একাজে যেন সমাজের অন‍্যান‍্য মানুষেরাও এগিয়ে আসে। তাই তাদের এই মন্ত্রে উদবুদ্ধ করতে হবে- “সকলের তরে সকলে আমরা/প্রত‍্যেকে আমরা পরের তরে।”

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ছাত্রসমাজ: আধুনিক সভ‍্যতার থাবায় পরিবেশের ভারসাম্য আজ ধ্বংসের মুখে। আজ পরিবেশকে বাঁচাতে আমরা অপারগ হলে আগামী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। তাই এগিয়ে আসতে হবে সকলকে। বর্তমানে সব শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের অবশ‍্য পাঠ‍্য বিষয় পরিবেশবিদ‍্যা। অধীত বিদ‍্যা থেকে তারা নিজরা সচেতন হয়ে, সচেতন করবে সমাজকে। আলোচনাসভা- সেমিনার – পোষ্টার- বৃক্ষরোপণ উৎসব প্রভৃতির সাহায্যে পরিবেশকে সুস্থ রাখার কাজে তারাই হবে অগ্রণী পথিক।

প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং মহামারি মোকাবিলায় ছাত্রসমাজ: জীবজগতের ধাত্রী হল প্রকৃতি। প্রকৃতি বিপর্যস্ত হলে, মানুষের জীবনে দেখা যায় চরম দুর্ভোগ। তখন দেখা যায় খাদ‍্যাভাব, জলাভাব,মানুষ খুঁজে বেড়ায় নিরাপদ আশ্রয়স্থল। তাই সমাজের এমন দুর্যোগের দিনে সর্বদাই সাহায‍্যের হাত বাড়িয়ে প্রস্তুত থাকা ছাত্রসমাজের অন‍্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য। ছাত্রসমাজ এক্ষেত্রে – দুর্যোগ মোকাবিলায় এলাকায় এলাকায় ত্রাণ তহবিল গড়ে তুলতে পারে, দুর্গতদের উদ্ধার এবং নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে আনতে পারে, দুর্যোগ কমে গেলে দুর্গতদের নিজগৃহে পাঠানোর ব‍্যাপারে সহায়তা করতে পারে। আবার মহামারি মোকাবিলায় মানুষের যা করণীয়, সেগুলি সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তুলতে পারে।

উপসংহার: আধুনিক সমাজ ছাত্রসমাজের সার্বিক উন্নতির সব ব‍্যবস্থা করে। তাই ছাত্রসমাজ সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে ছাত্রসমাজ এই দায়বদ্ধতার কথা ভুলে আত্মসুখ,আত্মউন্নতির জন‍্যই কেবল চৈষ্টা করে। এর জন‍্য বেশি দায়ী অভিভাবকবৃন্দ ও রাজনৈতিক নেতারা কিন্তু ছাত্রসমাজের মনে রাখা প্রয়োজন কবির সেই বাণী-
“উদয়ের পথে শুনি কার বাণী
ভয় নাই ওরে ভয় নাই,
নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান,
ক্ষয় নাই, তার ক্ষয় নাই।”

Leave a Reply

Your email address will not be published.

close